শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

একাগ্রতা-ধ্যানের অনুশীলন

  • তন্ময় আচার্য্য
  • ২০১৯-১১-১৭ ০৬:৫২:০৬
image

ধ্যান একটি প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে মনকে স্থির এবং নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস রপ্ত করা যায়। ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক উন্নতি, মনের সজীবতা এবং সৃজনশীলতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জগতের উপকারও মেলে। ধ্যানের সাথে একাগ্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “ধ্যানের তিনটি স্তর। প্রথমটিকে বলা হয় (ধারণা)—একটি বস্তুর উপরে, একাগ্রতার অভ্যাস। যেমন একটি গ্লাস। এই গ্লাসটির উপর আমার মন একাগ্র করতে চেষ্টা করছি। এই গ্লাসটি ছাড়া অপর সকল বিষয় মন হতে  দূর করে শুধু এর উপর মনঃসংযোগ করতে চেষ্টা করতে হবে। আর এর মাধ্যমে গ্লাসটি পুরাপুরিভাবে মনঃশক্তির অধীনে এসেছে, ইহা উপলব্ধি করিতে হইবে। কিন্তু মন চঞ্চল। … মন যখন দৃঢ় হয় এবং তখন চঞ্চল থাকে না, তখনই ওই  অবস্থাকে ‘ধ্যান’ বলা হয়। আবার ইহা অপেক্ষাও একটি উন্নততর অবস্থা আছে, যখন গ্লাসটি ও আমার মধ্যে পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয় (সমাধি বা পরিপূর্ণ তন্ময়তা)। তখন মন ও গ্লাসটি অভিন্ন হয়ে যায়। উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। তখন সকল ইন্দ্রিয়ের কর্মবিরত হয় এবং যে-সকল শক্তি অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথে ক্রিয়া করে, সেগুলি (মনেতেই কেন্দ্রীভূত হয়)।
মন নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়াকে বলা হয় একাগ্রতা এবং এমন নিয়ন্ত্রণকে ধরে রাখার দক্ষতাকে বলা হয় ধ্যান। মনের সাথে একাত্ম অর্জন করাই হচ্ছে সমাধি। মনকে শান্ত করার জন্য চাই স্থির সঙ্কল্প এবং প্রচেষ্টা। যোগের বই গুলিতে ধ্যান এবং একাগ্রতাকে অনেক সময় একি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক অনুশীলন যা ধ্যানের দক্ষতাকে বাড়ানোর সহায়ক তা একাগ্রতায়ও তালিকা করা হয়েছে।
সহজ কথায়, একাগ্রতা হচ্ছে একটি বস্তুর উপর মনকে স্থির করা। ওম স্বামী একাগ্রতা বৃদ্ধির জন্য চারটি অনুশীলনের কথা উল্লেখ করেছেনঃ
১। বাহ্যিক বস্তুর উপরঃ এই প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক কোনো বস্তুর উপর মনোযোগ রাখা হয়, চোখকে খোলা রাখা হয় যখন এই ধরণের একাগ্রতার অনুশীলন করা হয়।
২।  অভ্যন্তরীণ কল্পনাঃ এমন কিছু ভাবুন যা আপনাকে সন্তুষ্টি দেয়। এমন কিছু ভাবা উচিত নয় যা মনকে উত্তেজিত করে। চোখ বন্ধ করুন এবং বস্তুটি কল্পনা শুরু করুন।  কল্পিত বস্তুটি বারবারই বিলীন হয়ে যাবে, ধীরেধীরে এটিকে আবার আনার চেষ্টা করুন। এই বস্তুটি ধরে রাখার জন্য দারুন এক একাগ্রতার প্রয়োজন হয়।
৩। নিঃশ্বাসের উপরঃ একাগ্রতা গঠনের জন্য প্রাণায়াম অনুশীলন করবেন না। শুধু আপনার শ্বাসক্রিয়ার উপর লক্ষ্য রাখুন, নি:শ্বাসের ও শ্বাস ত্যাগের উপর মনোযোগ দিন। শ্বাসক্রিয়ার উপর মনোনিবেশ করুন। চোখ বন্ধ বা খোলা রাখতে পারেন।
৪। মন্ত্রের উপরঃ যে মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন সেটি মানসিক ভাবে জপ করুন। মূল বিষয় কিন্তু জপ নয়, ওম স্বামী বলেছেন মূল বিষয় হচ্ছে জপ শোনা। এটি করতে একাগ্রতার প্রয়োজন হয়। মন্ত্রটি শুনুন, যা আপনি মানসিক ভাবে জপ করছেন।
সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ধ্যান করার সময় কোন রকম বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ না করা। মানে কোন চিন্তা বা যা কল্পনা করছেন সেটিকে অনুসন্ধান না করা, প্রশংসা না করা, দোষারোপ না করা, শুদ্ধ ধ্যানের বিষয়কে মনোনিবেশ করতে হবে, মন বারবার মন্ত্র/শ্বাসক্রিয়া/ধ্যানের বিষয় বা কল্পনা থেকে  অন্য দিকে চলে যাবে, সাথে সাথে মনকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে।
বেশি সময় অমনোযোগী হয়ে ধ্যান করার থেকে যদি, দশ মিনিটও, সোজা আসনে বসে, একাগ্রতার সাথে ধ্যান অনুশীলন করা যায়, সেটা আরো তাড়াতাড়ি ফল এনে দেবে। 
পরবর্তী চল্লিশ দিনের জন্য সংকল্প করতে পারেন যে প্রতিদিন, পনেরো মিনিট করে, দুটি সেশান এ ভাগ করে একাগ্রতা অনুশীলন করবেন। অন্যান্য যে কোনো কিছুর মতো, অনুশীলনের মাধমেই একাগ্রতা বৃদ্ধি পাবে যা আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পূর্বশর্ত। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,
“বহির্জগতের অথবা অন্তর্জগতের যাবতীয় জ্ঞানই আমরা একটি মাত্র উপায়ে লাভ করি—উহা মনঃসংযোগ। কোন বৈজ্ঞানিক তথ্যই জানা সম্ভবপর হয় না, যদি নার সে বিষয়ে আমরা মন একাগ্র করতে না পারি। জ্যোতির্বিদ দূরবীক্ষণ-যন্ত্রের সাহায্যে মনঃসংযোগ করেন, … এইরূপ অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মনের রহস্য জানতে হলে এই একই উপায় অবলম্বনীয়। মনকে একাগ্র করে তা নিজের উপর ঘুরিয়ে ধরতে হবে। এই জগতে এক মনের সঙ্গে অপর মনের পার্থক্য শুধু একাগ্রতার তারতম্যেই। দুইজনের মধ্যে যার একাগ্রতা বেশী, সেই অধিক জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ।”
তথ্যসূত্র : https://os.me/ekagrata-the-practice-of-concentration/

 


এ জাতীয় আরো খবর