বুধবার, জানুয়ারী ২২, ২০২০

হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিক্যালে টেন্ডার দুর্নীতি : ৪০ হাজার টাকার ওজন মাপার যন্ত্র সাড়ে ৬ লাখ

  • শোয়েব চৌধুরী, হবিগঞ্জ :
  • ২০১৯-১২-০৫ ০২:১৬:৫৪
image

ছবি : এই সেই ওজন মাপার যন্ত্র, যা কেনা হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টাকায়, অথচ বাজারে এর দাম ৪০ হাজার টাকা।

হবিগঞ্জ  : মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি সম্বলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১শ থেকে ৫শ টাকায় পাওয়া যায়।অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮শ টাকা দরে। এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। দেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘ষ্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি কোম্পানীর ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারেক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানী ও মডেলের এই ইন্টারেক্টিভ বোর্ডটি কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। কম্পিউটার ও প্রজেক্টরের সমন্বয়ে স্পর্শ সংবেদশীল ইন্টাররেক্টিভ বোর্ডটি লেকচারের কাজে ক্লাসে ব্যবহার হয়। শুধু তাই নয়, উন্নত মানের ওজন মাপার যন্ত্র ৪০ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। ঠিকাদার এর মূল্য নিয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টাকা। এভাবেই পাতানো দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কয়েকগুণ বেশী দামে বই, ফার্নিচার, মাইক্রোস্কোপ, কম্পিউটার, ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। নতুন এই কলেজের জন্য সরকারের দেয়া প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা দরপত্রের নামে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও কলেজের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা প্রায় ১০ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 
হবিগঞ্জবাসীর বহু প্রত্যাশিত শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারী প্রথম বর্ষের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) ক্লাস শুরু হয়। ওই বছরের মে মাসে বইপত্র, জার্নাল, কম্পিউটার. ফার্নিচার, এসিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দুটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় দরপত্র আহবান করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দরপত্র কমিটির সভাপতি ডাঃ মোঃ আবু সুফিয়ান। দরপত্রে মোট ৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত দরদাতা (রেসপনসিভ) হিসেবে গ্রহণ করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। তথ্য অধিকার আইনে সম্প্রতি এই প্রতিনিধি কলেজ অধ্যক্ষের কাছে দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা সম্পর্কে তথ্য জানতে চান। অধ্যক্ষ সব তথ্যের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেননি। তবে তাঁর পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বইপত্র ও সাময়িকীর জন্য ৪ কোটি ৫০ লাখ, যন্ত্রপাতি অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য ৫ কোটি, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ, আসবাবপত্রের জন্য ১ কোটি টাকা, এম এস আরের (মেডিকেল এন্ড সার্জিকেল রিকোয়ারমেন্ট) জন্য ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। অধ্যক্ষের দেয়া ঠিকাদারদের সরবরাহ করা মালামালের বাজার দর বিশ্লেষণ করে অবিশ্বাস্য বেশ কিছু কাহিনী বের হয়ে এসেছে।
এতে দেখা যায়, ঢাকার শ্যামলী এলাকার বিশ্বাস কুঞ্জছোঁয়া ভবনের ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশী মালামাল সরবরাহ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বইপত্র, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মেডিকেল ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিল নিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪শ ৯ টাকা। সরজমিনে দেখা গেল সরবরাহকৃত বিভিন্ন মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনোভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০.কোর আই ফাইভ, সিক্স জেনারেশন) মূল্য নেয়া হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫শ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫শ টাকা। ঢাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারি প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা লিমিটেডের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এই মডেলের ল্যাপটপ তারা বিক্রি করছেন মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকা মূল্যের এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ) দাম নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯শ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার টেবিল ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪শ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের কোন স্টিকার লাগানো নেই। দেশের নামীদামি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান হাতিল ও রিগ্যালে খোজ নিয়ে জানা গেছে, এসব চেয়ারের মূল্য অর্ধেকের চেয়েও কম। এছাড়া বিলের তালিকায় ৬ নম্বরে আবারো কনফারেন্স সিস্টেম নামে ৫০ জনের জন্য (জনপ্রতি ২১ হাজার ৯শ টাকা) ১০লাখ ৯৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত সাধারণ মানের ১৫টি বুক সেলফের মূল্য ৬লাখ ৬০ হাজার, ৫টি স্টিলের আলমিরা ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র‌্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ৬৪৭৫টি বইয়ের জন্য ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬শ ৬৪ টাকা। শুধু তাই নয় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিকের মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারী (২ ভলিয়মের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা। নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫শ ৫০ টাকা। রাজধানীর মতিঝিলের মঞ্জরী ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকোলার মাইক্রোস্কোপের মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩শ ২৫ টাকা। বাজারে এর মূল্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩শ টাকা। জেনারেল কোম্পানীর শোরুমে ২ টন স্পিল্ট টাইপ যে এসির মূল্য ৯৮ হাজার টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল একই কোম্পানী ও মডেলের এসির দাম ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩শ ৯০ টাকা। একই কোম্পানীর ও মডেলের ফ্রিজের মূল্য গুণতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এরকম ৬টি ফ্রিজ কেনা হয়। ল্যাবরেটরীতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিন ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম নেয়া হয়েছে। ওই মেশিনটি দেখতে এই প্রতিনিধি ৪ দিন মেডিকেল কলেজে গিয়েও তা দেখার সুযোগ পাননি। অনেক খোঁজাখুজি করেও যন্ত্রটির সন্ধান পাননি কলেজের প্রধান অফিস সহকারি (সম্প্রতি অবসরজনিত ছুটিতে গেছেন) সজল দেব। তবে মালামাল রক্ষিত স্টোররুমে ৮শ টাকার মূল্যের একটি ওজন মাপার যন্ত্র দেখা গেছে। একটি বেসরকারি হাসপাতালের ল্যাবরেটরীতে কর্মরত পবিত্র দেবনাথ বলেন, অত্যন্ত স্পর্শকাতর ওজন মাপার এ মেশিন বড় জোর ৩০/৪০ হাজার টাকার বেশী হওয়ার কথা নয়। সরবরাহকৃত বইয়ের তালিকা দেখে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মেডিকল কলেজের দুজন শিক্ষক বলেন, যেসব বই কেনা হয়েছে এর কিছু বই এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের কোন কাজে লাগবে না। কারণ এসব বই গবেষণার কাজে লাগে। তারা বলেন, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ১ম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন ৩য় বর্ষে পদার্পণ করেছেন। আগামী ২০২২ সালে তারা ৫ম বর্ষে পৌঁছুবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে ৫ম বর্ষের পড়ানোর জন্য বই কিনতে হবে এর কোন যৌক্তিকতা খুজে পাই না। বরং শিক্ষার্থীরা নতুন সংস্করনের বই থেকে বঞ্চিত হবে। সরবরাহকৃত বইয়ের মধ্যে ঢাকার নীলক্ষেতে কালার প্রিন্টারে ফটোকপি ও বাধাই করা বইও থাকতে পারে বলে অনেকের সন্দেহ। এছাড়া ওয়ালটন ও সনি কোম্পানীর ৬টি টিভির মূল্যও নেওয়া হয়েছে ২/৩ গুণ বেশী।
দরপত্র কমিটি নিয়ে নানা কথা
দুর্নীতি যা-ই হোক, কেনাকাটা স্বচ্ছ হয়েছে তা দেখাতে কোন আয়োজনই কম ছিল না কলেজ কর্তৃপক্ষের। গঠন করা হয় তিনটি কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে দরপত্র মনোনয়ন কমিটি, বাজার দর যাচাই কমিটি, মালামাল গ্রহণ কমিটি। দরপত্র কমিটির সভাপতি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডাঃ আবু সুফিয়ান জিনিসপত্রের বাজার দর যাচাইয়ের জন্য গত বছরের ১৪ মে কলেজের প্রভাষক ডাঃ শাহীন ভূইয়াকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করে দেন। সময় দেয়া হয় ১৭ মে পর্যন্ত। ওই কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন প্রভাষক ডাঃ কুদুছ মিয়া, ডাঃ পংকজ কান্তি গোস্বামী। ওই কমিটিকে কম্পিউটার, বই, এসি, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন জিসিসের বাজার দর দাখিল করার জন্য চিঠি দেন। জানতে চাইলে বাজার দর যাচাই কমিটির প্রধান ডাঃ শাহীন ভূইয়া বলেন, দায়িত্বশীলতার সাথে জিনিসপত্রের দাম যাচাই করা হয়েছে। ৩দিনের সময়ের মধ্যে কিভাবে এতোসব জিনিসের বাজার দর জানা সম্ভব হলো প্রশ্ন করা হলে তিনি হেসে বলেন, সরকারি কেনাকাটা কিভাবে হয় তা তো জানেনই। অপর দুই সদস্য জিনিসের বাজার দর কিভাবে যাচাই করেছেন তা স্মরণ করতে পারেননি। কলেজের একটি বিশস্থ সূত্র জানান, বাজার দর যাচাই না করে ‘পছন্দের ঠিকাদারের’ দেয়া বাজার দরের তালিকায় ওই কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা শুধু স্বাক্ষর করেছেন। কমিটির দেয়া ‘বাজারের মূল্য তালিকার’ সাথে ঠিকাদারের দেয়া জিনিসের দাম বেশ মিল পাওয়া গেছে। যেমন বাজার দর কমিটি টেন হেড মাইক্রোস্কোপ মেশিনের মূল্য ১ কোটি ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা, লেজার জেট কালার প্রিন্টারের মূল্য ২লাখ ৫২ হাজার টাকা, ইন্টারেক্টিভ বোর্ড ১৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩শ ৩৩ টাকা উল্লেখ করেছেন। আর ঠিকাদার দরপত্রে টেন হেড মাইক্রোস্কোপ ১ কোটি ৫ লাখ, লেজার জেট কালার প্রিন্টার ২লাখ ৪৮ হাজার ৯শ টাকা, ইন্টারেক্টিভ বোর্ড ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। এভাবে কাছাকাছি মূল্য দিয়ে অন্যান্য মালামাল সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নেয় ঠিকাদারগণ।
হবিগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, দরপত্র আহবান কমিটিতে তৎকালিন সিভিল সার্জন ডাঃ সুচিন্ত চৌধুরীকে সদস্য রাখা হয়। দরপত্র সংক্রান্ত কোন সভায় তাকে ডাকা হয়নি। মজার ব্যাপার হলো, সভায় তাকে না ডাকলেও সভার পর উপস্থিতির তালিকায় তার স্বাক্ষর নিতে চাইলে সিভিল সার্জন সুচিন্ত চৌধুরী তাতে স্বাক্ষর দেননি। উপরন্তু কলেজ অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়ে দরপত্র সংক্রান্ত কোন সভায় তাকে না ডেকে উপস্থিতির তালিকায় কেন স্বাক্ষর দিতে হবে এর কারণ জানতে চান। জানতে চাইলে ডাঃ সুচিন্ত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির অপর সদস্য জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক ডাঃ নাসিমা খানম ইভা প্রথমে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে ছিলেন না বলে দাবি করেন। দরপত্র মূল্যায়নের কাগজপত্রে তার স্বাক্ষর আছে জানালে ডাঃ নাসিমা বলেন ‘আমি কোন সভায় যাইনি। তবে অফিসিয়াল ফর্মালিটিজ হিসেবে হয়তো পরে স্বাক্ষর দিয়েছি। কোন দুর্নীতি হলে আমি এর দায়ভার নেব না।’
মালামালের হাল হকিকত
ঠিকাদারের সরবরাহ করা মূল্যবান বই, কম্পিউটার, মাইক্রোস্কোপসহ বিভিন্ন মালামাল কলেজের অস্থায়ী ভবনের স্টোরের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। কয়েকজন কর্মচারীদের সাথে আলাপে জানা গেল সরবরাহ করার কিছুদিন পরেই ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরজমিনে দেখা গেল হালকা স্টিলের তৈরী ফাইল কেবিনেট থেকে এখনই রং উঠে যাচ্ছে। কাঠের চেয়ারগুলোর যে ভাল মানের নয় তা দেখেই বোঝা যায়। শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের নিজস্ব ভবন নেই। হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের নয়া ৮ তলা ভবনের ২য় ও ৩য় তলায় সকল কার্যক্রম চলছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ১০জন সহকারি অধ্যাপক, ১০জন প্রভাষক সহ মোট ৩৭ জন বিভিন্ন শ্রেনীর কর্মচারি রয়েছেন।
বিল পাশ করতে দৌঁড়ঝাপ
২০১৮ সালে জুন মাসের শেষ দিকে ঠিকাদারদের বিল কলেজ কর্তৃপক্ষ হবিগঞ্জ জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠান। বিল পাশ করাতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডাঃ সুফিয়ান থেকে শুরু করে স্থানীয় ও ঢাকার একটি মহল ছিল বেশ তৎপর। জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের একজন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন বিলের চেক পাশ করানোর জন্য কলেজের অধ্যক্ষকে যেভাবে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে দেখেছি মনে হয়েছে তিনি বুঝি ঠিকাদার। বিলের চেক তাড়াতাড়ি দেওয়ার তদবিরের জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে পড়ি।
এদিকে, কলেজ থেকে পাঠানো কাগজপত্রে টেন্ডারে মালপত্র ক্রয় করা বাবত নির্ঝরা এন্টাপ্রাইজ ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪শ ৯টাকা, পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা বিলের তথ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জেলা হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকার এম এম জিন্নাত আলী বুক গ্যালারীকে ১০ লক্ষ ৩৩ হাজার ১৫৪ টাকা, বিএফআইডিসি কে ২৪ লাখ ৯৮ হাজার ৯শ ৪৪ টাকা, মেসার্স কুতুবুল আলমকে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ২শ ৬২ টাকা, কাজলা টেকনোলজিস্টকে ১০ লাখ ১২ হাজার, ট্রেডসওয়ার্থ লিঃ কে ১ লাখ ৮২ হাজার ৭শ ২৬, ঢাকা সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল স্টোরকে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯শ ১৫ টাকা, মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজকে ১ লাখ ৭০ হাজার ৪শ ৩টাকার বিল দেওয়া হয়েছে। টেন্ডারে অংশ নেয়া নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ ও পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ছাড়া বাকীসব প্রতিষ্টানগুলো কি কি পণ্য সরবরাহের জন্য অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তারা টেন্ডার বা কোটেশনে অংশ নিয়েছিল কি না প্রশ্ন করা হলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তা এড়িয়ে যান।
কলেজ অধ্যক্ষের বক্তব্য 
শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডাঃ আবু সুফিয়ান বলেন, সরকারি কেনাকাটার সব ধরনের আইন ও বিধি মেনে দরপত্র কার্যক্রম চালানো হয়েছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া বা কোন দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। অডিট রিপোর্টেও জিনিসপত্র কেনাকাটায় সম্পর্কে কোন নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি। বেশ কিছু নিম্নমানের পণ্য ও বাজার দরের কয়েকগুণ বেশী দাম দেয়ার বিষয়ে নজরে আনলে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উপর দোষ চাপিয়ে দেন। একপর্যায়ে ঠিকাদারের সরবরাহকৃত নিজের টেবিলটি দেখিয়ে বলেন এটি সেগুন কাঠের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর অধিকাংশ জায়গায় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে হালকা বোর্ড। অথচ দাম দিতে হয়েছে সেগুন কাঠের।

 


এ জাতীয় আরো খবর