শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

‘যে হৃদয় খুঁজে ভালবাসা’

  • সারওয়ার চৌধুরী :
image

সারওয়ার চৌধুরী : আট ঘন্টার সাথে আরও পাঁচ ঘন্টার ওভার টাইম । শরীর, মন কিছুই আর তর সইছিলো না .... শুক্রবার রাত, মনের মধ্যে নির্মল প্রশান্তি যে নেক্সট দুইদিন আর সকাল সকাল কাজে আসার জন্যে তাড়াহুড়ো করতে হবেনা। স্ট্রেসমুক্ত থাকবো। একরাশ খুশির ঝিলিক নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেব।  এমন সময় দেখলাম মাইকেল নামের ছেলেটা এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। প্রচণ্ড রাগে আমার ভেতরটা ফুসে উঠলো -- এই বারো  বছরের ছেলেটার জন্যই সারাটা দিন আমার উপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝাকুনি গেছে ----- সকালে স্কেনিংয়ের সময় মাইকেল যখন ওয়াক থ্রো পার হচ্ছিল। তখন মেশিনের সব কটা লাইট জ্বলে উঠে...। কিছুদিন আগে একজন ছাত্রের হাতে আরেকজন ছাত্র খুন হওয়ার পর থেকে আমাদের উপরে সবার নজরদারী যেন একটু বেশী। তার উপর আবার সর্বত্র ক্যামেরা আতঙ্ক। " হোয়াই ইউ লাইটিং আপ সো হাই ? চেক ইউর সেলফ প্লীজ । " আমি তাকে বললাম । " নাথিং " প্রচণ্ড বিরক্তি আর অবজ্ঞার সাথে সে আমাকে জানায় । " ইয়াংম্যান, ইফ ইউ লাইটিং আপ লাইক দিছ , ইউ হেভটু গো এগেইন থ্রো দ্যা মেশিন অর ইউ হেভটু টেইক হ্যান্ড সার্চ। " কিছুটা রাগ্বত স্বরে তাকে আমি জানালাম । প্রচণ্ড রাগ আর বিরক্তির সাথে খেদোক্তি করে  সে সব মেটাল ইন্সট্রুমেন্ট বাক্সে রেখে ওয়াক থ্রো করল, এভাবে প্রায় প্রতিদিনই ছেলেটা বিরক্তিকর আচরণ করে । মনে মনে বলি বেটা তোর ভাগ্য ভাল যে এমেরিকায় জন্মেছিস, বাংলাদেশ হলে ডান্ডিয়ে তর মত বাছাধনকে ঠিক করে ফেলতাম । রাগটাকে সামলিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম " থ্যাংক ইউ "। 
ব্রেকটাইমে লাঞ্চ খেতে যাব , তখন সুপারভাইজার রেডিওতে জানাল অফিস রুমে গিয়ে ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজগুলো চেক করতে, মাইকেল নামের সেই ছেলেটা মিসিং হয়েছে। ভীষণ রাগ হচ্ছিলো  মাইকেলের উপর । এখন আমাকে ক্যামেরা চেক করতে হবে, সেন্ট্রালে কল দিতে হবে, অসংখ্য পেপার ওয়ার্ক করতে হবে ---- মগজের চরম অবস্থা নিয়ে অফিস রুমে একটার পর একটা ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ চেক করছি। ঠিক তখন  সুপারভাইজার আবারও রেডিওতে জানাল ছেলেটাকে স্কুলের ভেতরেই একটা নিরিবিলি রুমে লোকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে ... ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা । যাইহোক কিছুটা স্বস্তি পেলাম, পেপার ওয়ার্ক আর বসদের বিভিন্ন অস্বস্তিকর প্রশ্নবান থেকে এ যাত্রায়  মুক্তি পাওয়া গেল ।
এখন বাড়ী যাওয়ার সময় আবার সেই ঝামেলা, আবার সেই একরোখা বেয়াদব মাইকেল। অনেক কষ্টে রাগটাকে দমন করে কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম-  "এখনও তুমি এখানে ,বাড়ী যাচ্ছনা কেন ? "  নিচুমাথাটা তুলে লজ্জিত ভাবে আমার দিকে তাকালো, ওর চাহনিতে এই প্রথম যেন আমি অন্যরকম একটা অনুভূতির পরশ পেলাম -- আমি কিছু বলার আগেই কাতরভাবে  বলল " মি: চৌধুরী, সকালের আচরণের জন্যে আমি দুঃখিত। স্কেনিংয়ের পরে যখন ক্লাসে যাই, তখন বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল, আমার শরীরে নাকি গন্ধ, জামা ময়লা, আমি কুৎসিত, কেউ আমাকে পছন্দ করেনা। ভালবাসে না .... ওদের এরকম আচরণের কারনে আমি ক্লাস থেকে বের হয়ে বাথরুমে লুকিয়ে থাকি। সবাই খোঁজা-খোঁজি করে বাথরুম থেকে বের করে নিয়ে আসে। প্রিন্সিপাল আমার বাবাকে খবর দিলে তিনি আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে যান। একশ্বাসে এতগুলো কথা বলে মাইকেল একটু দম নেয় । ওর কাতরভাবে কথা বলা দেখে আমার রাগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। উপরস্তু এখন তার চেহারার মধ্যে যেন একটা মায়াবী আভা ফুটে উঠেছে। যে ছেলেটাকে একদমই সহ্য করতে পারতাম না, যাকে সবসময় মনে হত নোংরা একটা বখাটে বেয়াদব ছেলে তার প্রতি কেন জানি অন্যরকম একটা মায়া অনুভব করলাম । বাবা যখন বাড়ীতে নিয়ে গেলেন তখন এতরাতে আবার বাইরে আসলে কেন ? আর তোমার মা ই বা কোথায় ?  আমি জানতে চাইলাম। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মত ওর দুটো চোখ ছলছল করে উঠে।  আমার মা এখনও কাজে বাড়ীতে যাওয়ার পর বাবার প্রচণ্ড রাগ দেখে ভয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে যাই। লাঞ্চের আগে স্কুল থেকে চলে আসায় এখন পর্যন্ত কিছু খাওয়া হয়নি। আমি এতক্ষণ মাইকেলের কথাগুলো শুনছিলাম। ওর বয়সী আমারও ছেলে আছে।  নিজের উপরে নিজেরই প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে- কথা না বাড়িয়ে তাকে নিয়ে গেলাম রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টটায় । বললাম  তোমার যা ইচ্ছে খাও। আমার কথায়  তার চেহারার মধ্যে অদ্ভুত মায়াবী এক আনন্দ ঝিলিক ফুটে উঠে। ছেলেটা খাচ্ছে আর আমি তার দিকে চেয়ে আছি। ভালবাসাময় অন্যরকম এক ভাললাগায় যেন আমি আচ্ছন্ন। ওর খাওয়া শেষ হতেই রেস্টুরেন্ট থেকে দুজনে বেরিয়ে আসলাম । রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্য ত্রিশের একজন মহিলাকে দেখিয়ে মাইকেল বলল ঐ যে আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন।  সামনে যেতেই মা প্রচণ্ড স্নেহের আবেশে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। আমি তোকে এখানে না দেখে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম । "  ----আমি তো মনে করেছিলাম খুব রাগ করে মা জানতে চাইবেন কেন সে এত রাতে এখনও বাড়ী যায়নি ? কিন্তু না মনে হল এ প্রশ্নটা মায়ের কাছে অবান্তর। কেন সে বাড়ী যায়নি মায়ের যেন সেটা ভাল করেই জানা। মাইকেল আমার দিকে ইশারা করে মাকে জানায় ইনি মি: চৌধুরী। আমাকে পেট ভরে ডিনার খাইয়েছেন। মায়ের দৃষ্টি  এবার আমার দিকে। চাহনীতে অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা...।আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ মি: চৌধুরী। আমিও মহিলাকে ধন্যবাদ বলে নিজের ভেতরে ঘূর্ণিত একটা জিজ্ঞাসা সংবরণ করতে না পেরে জানতে চাইলাম যদি আপনি মাইন্ড না করেন , তবে একটা কথা জানতে চাই ।" 
জ্বী বলেন......
আপনি কি জানেন, কেন এত রাত পর্যন্ত মাইকেল বাড়ী যায়নি ? ---- দেখতে পেলাম, লজ্জা আর সংকোচে মহিলার গাল দু খানা অনেকটাই লাল হয়ে গিয়েছে । মি: চৌধুরী  বাড়ীতে মাইকেলের সৎ বাবা। তিনি তাকে পছন্দ করেন না এমনকি সহ্যও করতে পারেন না। ছেলেটার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তার বাবার সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপর থেকে আপন বাবাও ছেলেটার খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা। এত বড় পৃথিবীতে আমিই তার একমাত্র আপনজন। তার বাবা কিংবা সৎবাবা কেউই দায়িত্ব না নেয়ায় আমাকে বাধ্য হয়েই কাজ করতে হয়। মাইকেলের বাবার সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর শুধু ছেলেটার কথা চিন্তা করেই আবার বিয়ে করেছিলাম। এতগুলো কথা বলে ভদ্র মহিলা একটু বিরতি নেন। চোখ দুটো ছলছল করছে। কতদিনের না বলা কথাগুলো বলতে পেরে ভেতরে জমে থাকা দুঃখের যন্ত্রণা গুলো যেন গলে গলে চোখের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে -------- । লোকটার সাথে আমার আরও একটা ছেলে ও একটা মেয়ে আছে । ভদ্র মহিলা আবারও শুরু করলেন।  ঐ সন্তানগুলো হওয়ার পর থেকেই সে ধীরে ধীরে মাইকেলকে ঘৃণা করা শুরু করে। আমিও ঐ দুটো সন্তানের কথা চিন্তা করে লোকটার সাথে আছি । মাইকেলের মত তাদেরকেও পিতৃস্নেহ হীন করতে চাইনা। এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে মাইকেলের মা থামলেন। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগে রাখা ট্যিসু দিয়ে চোখের উপর দিয়ে আসা এতদিনের অব্যক্ত বেদনার জলগুলো মুছতে লাগলেন । আমিও কোন শব্দ খোঁজে পাচ্ছিলাম না তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার। সন্তানের স্বার্থে মায়েদের ত্যাগের কোন তুলনা হয়না। একমাত্র মায়েদের পক্ষেই সম্ভব এরকম নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা সৃষ্টি করা । আর মাইকেল যে ছেলেটাকে তার বাহ্যিক আচরণ দেখেই বিচার করতাম- সেই মাইকেলকে এ মুহুর্তে আর বিরক্তিকর, নোংরা কিংবা বেয়াদব মনে হচ্ছেনা। যেন আমার ছেলেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর সহ্য থাকতে পারলাম না। দু হাত বাড়াতেই মাইকেল আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারছিলাম ভালবাসার তৃষ্ণা না পাওয়ার বেদনা, মানুষের ঘৃণা আর নেতিবাচক আচরণ তার কোমল শিশু হৃদয়ে যে পাথর হয়ে জমেছে। সেগুলো যেন গলে ঝরছে । মাইকেল যে কত সুন্দর আর বড় মনের অধিকারী সেটা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারিনি। তা নাহলে যে সৎবাবা সবসময় মাইকেলকে ঘৃণা করেন। বাজে ব্যবহার করেন তাঁর সম্পর্কে একটিবারের জন্যেও সে কোন বাজে শব্দ ব্যবহার করেনি।একবারের জন্যে বলেনি যে লোকটি তার সৎবাবা । আমাদের সাথে মাঝেমধ্যে যে বিক্ষিপ্ত আচরণ করে সেটা হয়তোবা তার কোমল হৃদয়ের ভালবাসা না পাওয়ার হাহাকার । স্বার্থহীন ভালবাসা দিয়েই আমরা মাইকেলের মত শিশুদের তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের চপলতাকে দূর করতে পারি । শিশুদের বাহ্যিক আচরণের মাধ্যমে বিচার না করে  খুঁজে বের করতে হবে পেছনের কার্যকারণ গুলো । আমাদের একটু ভালবাসা , একটু স্নেহ, মনোযোগ পেলে হয়তো মাইকেলরা তাদের সমস্ত দুঃখ বেদনা ভুলে তাদের মনে লুকানো কথাগুলো আমাদের কে বলতে পারে । আর আমারও তাদেরকে সমাজের আবর্জনায় রূপান্তরিত হওয়া থেকে উদ্ধার করে সম্পদ হিসেবে পেতে পারি। 
মা - ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ী স্ট্রাট দিলাম। গাড়ী ছুটছে আর আমার মাথায় ছুটে বেড়াচ্ছে মাইকেল ভাবনা। এভাবে অগণিত মাইকেল আর তাদের মায়েরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। তাদের অমিমাংসিত অসংখ্য সমস্যার সমাধান  হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে আমরা করতে পারবনা। কিন্তু অন্তত মানবিকভাবে ভালবাসাপূর্ণ সহানুভূতি নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারি। যাতে পৃথিবীর সবাইকে তারা হৃদয়হীন ভালবাসাহীনদের কাতারে না দেখে। আর এভাবে  কিছুটা হলেও তাদের হৃদয়ে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা - ভালবাসা, কৃতজ্ঞতাবোধ উদয় হবে। তারা নিজেদেরকে আর অসহায় মনে করবে না।

 


এ জাতীয় আরো খবর