বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

ছোট গল্প : আলোর মুখ

  • শাহারা খান :
image

মিসেস জুবায়দার জন্য আজকের দিনটি অনেক আনন্দের। তার প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। মা হিসেবে নিজেকে আজ গর্বিত মনে হচ্ছে।মানবতার সেবায় জয়ী হয়ে ছেলে আজ ঘরে ফিরছে। খবর পেয়েই জুবাইদা নফল নামাজ আদায় করলেন। দারওয়ানকে দিয়ে এতিম খানায় খাবার পাঠালেন। ভোর থেকেই ঘর, দরজা-জানালা পরিষ্কার করা শুরু করলেন। পছন্দমতো রাঁধলেন। আজ তার স্বপ্ন স্বার্থক হয়েছে। দেয়ালে টানাটো স্বামীর ছবির দিকে অশ্রু সজল চোখে তাকিয়ে বললেন, ওগো তোমার অভির আজ দ্বিতীয় জন্ম হলো। আমার অন্ধকার ঘর আজ আবার আলোয় ভরবে।
ইন্জিনিয়ার স্বামী আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে জুবাইদার বেশ সুখে, শান্তিতে দিন যাচ্ছিল ঢাকা শহরে। তবে এই সুখ তার কপালে বেশি দিন স্থায়ী হলোনা। একমাত্র ছেলে অভির বয়স যখন দশবছর।হঠাৎ করে হাজবেন্ডের শরীরে নানান অসুখ দেখা দিলো। প্রথমে ডায়বেটিস। তারপর হার্টের সমস্যা, কিডনী ডেমেইজ ,শ্বাস কষ্ট। টানা দু’বছর অসুখের সাথে লড়তে লড়তে তারপর অকালে বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। জুবাইদার জীবনে নেমে এলো অন্ধকার। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ায় অনেকই স্বার্থের জন্য কাছে এসেছেন। কিন্তু জুবায়দা মামুনের জায়গায় আর কাউকে স্থান দিতে চাননি। একমাত্র ছেলের দিকে তাকিয়ে এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। মামুনের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেকে ডাক্তারী পড়াবেন।মাশাআল্লাহ ছেলেও লেখাপড়ায় বেশ ভালো। আর তাই স্বামীর সখ আর নিজের ইচ্ছার উপর ভর করে জুবায়দাও ছেলেকে সেইভাবে গড়ে তুলেছেন।
ইন্টার্নী শেষ করে বিভিন্ন হাসপাতালে জবের জন্য অভি চেষ্টা করছে কয়েক মাস ধরে। ২/১ জায়গায় ইন্টারভিউও দিয়েছে। আল্লাহর রহমতে 
ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে। এর মধ্যে শুরু হলো বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাসের উপদ্রুপ। প্রথম অবস্থায় রোগের বিস্তার ব্যাপক না হলেও আস্তে আস্তে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। রোগ সংক্রমন থেকে রক্ষা পেতে সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। সেবাদান করতে গিয়ে ডাক্তার, নার্সও এই রোগ সংক্রমিত হয়ে অনেকে মারা যাচ্ছেন।স র্তক থাকতে সকলেই জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। ভয়, আতঙ্কে কাটছে মানুষের জীবন। এরই মধ্যে এলো অভির এপয়েন্টমেন্ট লেটার। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে অভির চাকুরী হয়েছে। স্পেশালিস্ট ডাক্তারের সাথে অভিকে কাজ করতে হবে করোনা রোগীর সাথে। সংবাদটি একদিকে যেমন আনন্দের অন্যদিকে খুবই আতঙ্কের। প্রতিদিন যে হারে করোনা রোগীর সংস্পর্শে সেবাদান কারী আক্রান্ত হচ্ছেন; আবার অনেকে মারাও যাচ্ছেন। এই সংবাদ শুনে কোন মা’ই পারবেনা সন্তানকে এই কাজে এগিয়ে দিতে। কিন্তু ডাক্তারের কাজই তো মানবতার সেবা। অভিও মাকে বুঝালো মাগো এই তো বড় সুযোগ মানবতার সেবা করা। আমি ডাক্তার হয়ে শুধু নিজের চিন্তা করলে হবেনা। মানবতার সেবাই যে আমার ধর্ম।জুবাইয়দাও মনকে শক্ত করলেন।      
আল্লাহর উপর ভরসা করে অভি মায়ের দোয়া নিয়ে পরদিন সকালে হাসপাতালের উদ্দশ্যে বের হলো। আপাতত হাসপাতালের নিকটবর্তী হোটেলেই থাকতে হবে। বাসায় ফেরা যাবেনা। জুবায়দা আঁচলে চোখ মুছে ছেলেকে বিদায় দিলেন। হয়তো এ জীবনে ছেলের সাথে আর দেখা নাও হতে পারে। তারপরেও ছেলেকে শান্তনা দিয়ে সাহস নিয়ে কাজ করতে বললেন। ছেলেকে বিদায় দিয়ে একলা নিঃসঙ্গ ঘরে নফল নামাজ, তেলাওয়াত করে দিন কাটাতে লাগলেন। মাঝে মধ্যে অভির সাথে মোবাইলে ভিডিও কলে কথা হয়। ছেলের চেহারা দেখে জুবাইদার বুক ফেটে যায়। তারপরও কষ্টে হাসিমুখে ছেলের সাথে কথা বলেন।
বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাস আতঙ্ক দূর হলো। জেগে উঠলো প্রকৃতি নতুন সাজে। মানবমনে আনন্দের সঞ্চার হলো। সবার মুখে হাসি। কারো পাশে যেতে আজ নেই কোন বাধা। গলায় গলা মিলিয়ে করে সবাই কোলাকুলি। ঘরে ঘরে উপাসনালয়ে চলে শুকরিয়ানা নামাজ। কতজনের কত শত ব্যথা, প্রিয়জন হারানোর কষ্ট, কত নানান অভিজ্ঞতা করোনাকে নিয়ে,এ কে অন্যের সাথে সেয়ার করছে। এত কষ্টের পর ধরনী করোনা মুক্ত হওয়ায় আজ সবাই আনন্দে আত্মহারা।
দানশীল মহিলা হিসেবে মিসেস জুবাইদা পাড়া, মহল্লাবাসী সকলের কাছে পরিচিত। বিগত করোনা ভাইরাসে যখন অনেকের ঘরে নেমে আসে অভাব, অনটন। জুবাইদা সেইসময়  সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে অনাহারীদের বাড়ি বাড়ি খাবার পাঠিয়েছেন। তাদের খোঁজ নিয়েছেন নিয়মিত। আজ তাই তার আনন্দে শরীক হতে মহল্লার অনেকে এসে সমবেত হয়েছে বাড়ির আঙ্গিনায়।কিছুক্ষণের মধ্যে সরকারী গাড়ি চড়ে গৃহে প্রত্যাগমন করলো অভি। একমাত্র ছেলেকে সুস্থদেহে ফিরে পেয়ে জুবাইদার মন আনন্দে ভরে উঠলো। অন্ধকারের পর জুবাইদা আবার দেখলেন আলোর মুখ।
লেখিকা-শাহারা খান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী
(গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তবে আমরা আশাবাদী ধরনী একদিন করোনা মুক্ত হবে। সবার ঘর আলোকিত হবে। অভির মতো ফ্রন্ট যোদ্ধা যারা মানবতার সেবা করে যাচ্ছেন, তারা বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরবেন।)


এ জাতীয় আরো খবর