শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৯

রুমা মোদকের জীবনের গল্প

  • সাহিত্য ডেস্ক :
  • ২০১৯-০৩-০১ ২১:২০:২১
image

[ রুমা মোদক। একজন কবি, সাহিত্যিক, নাট্যাভিনেত্রী ও নাট্যকার। সেই সঙ্গে একজন কলামিস্টও। হবিগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গনে এক আলোজিত নাম। তিনি ফেসবুকে নিয়মিত স্টেটাস দিয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে লিখেন জীবনের গল্পও। যে গল্প অতীতকে নিয়ে। ছোট ছোট এ গল্প গুলো পাঠকদের হৃদয় না ছুয়ে পারে না। অতীত সব সময় সুন্দর ও সোনালী। ভবিষ্যত অনিশ্চিত। ভাল-মন্দে বর্তমান। তাই অতীতকে অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষ অতীতকে স্বীকার করতে দ্বিধা-সংকোচে ভুগেন। হবিগঞ্জের আরেকজন আলোকিত মানুষ ব্যারিষ্টার সৈয়দ সাইদুল হক সুমন। সম্প্রতি তিনি অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক সাক্ষাতকারে বলেন, বাবার জানাযায় আসার জন্য টাকা ছিল না। আজ ব্যারিষ্টার সুমন দেশ ও সমাজের উন্নয়নে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছেন। ইতিমধ্যে তিনি সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন। ফেসবুক লাইভ প্রোগ্রামের মাধ্যমে তিনি এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

রুমা মোদক কিংবা ব্যারিষ্টার সুমনের মতো মানুষ সমাজে খুবই বিরল। আজ তাদের অতীতের স্মৃতিচারণ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। অতীত ও বর্তমান নিয়েই জীবন। দ্বিধা-সংকোচে আক্রান্ত মানুষসহ বর্তমান প্রজন্ম রুমা মোদক কিংবা ব্যারিষ্টার সুমনের আদর্শ অনুসরণ করলে সমাজ উপকৃত হবে। সুপ্রভাত মিশিগান আলোর সাথে, ভালোর সাথে চলবে নিরন্তর। ব্যক্তি রুমা, সুমনের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার জয় হউক। সাহিত্যিক রুমা মোদকের লেখা এই ছোট গল্প গুলো বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। তার আরো কিছু গল্প একত্রিত করে সুপ্রভাত মিশিগান পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ]

এই জেলা শহরে আজ শনিবার। মার্কেট দোকানপাট সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রতিটি শনিবারেই এই শহর পুরানো শহরের চেহারা নেয়, দু’য়েকটা রিক্সা, হালকা-পাতলা ইজি বাইক, দোকানগুলোর ঝাঁপ বন্ধ, রাস্তায় ভীড়ভাট্টা নেই। শনিবার মানেই তাই সকাল সকাল রাস্তায় বেরিয়ে মন ভালো হয়ে যাওয়া। তবু আজকের শনিবারটা একদম অন্যরকম। অন্য শনিবারগুলোর চেয়ে সুনসান। লুকিয়ে চুরিয়ে খোলা রাখা দুয়েকটা বেয়াড়া দোকানের ঝাঁপও আজ বন্ধ। মোড়ে মোড়ে গোটাকয় সমবয়সীদের জটলা। ১১ ডিগ্রি সেলিসিয়াসের স্যাঁতসেঁতে দিনে মিশে যাচ্ছে চায়ের ঘ্রাণ আর নিকোটিনের ধোঁয়া। হালকা ভেসে থাকা রোদে একদম তেজ নেই, সবাই জবুথবু। ঠাণ্ডা বাড়ছে...সাথে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।  সারা শহর সেজে আছে বিয়ে বাড়ির মতো। সারি সারি পোস্টার। নৌকা, ধানের শীষ, হাতপাখা, মাঝে একটু আধটু উঁকি দিচ্ছে দুয়েকটা কাস্তে। আমার সাথে ইজি বাইকে সহযাত্রী হলেন আজ আমার বাবার একজন সহকর্মী। কিগো মামনি কেমন আছো, অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম, তোমার মায়ের শরীরটা কেমন-বলে চাচা শুরু করেন সেই আমলের কথা। আমার বাবার তখন চাকরির প্রায় শেষ সময়, যখন চাকরির শুরু। দু’জন একসঙ্গে ডিউটি করেছেন কন্ট্রোল রুমে। হ্যা আমার খুব মনে আছে। ইলেকশনের দিন দুপুরে খেয়ে দেয়ে কন্ট্রোল রুম ডিউটিতে যেতেন বাবা, ফিরতেন সেই মধ্যরাতে। চাচা বলতে থাকেন, এখন তো কন্ট্রোল রুম ডিউটি কোন ডিউটিই না। সবাই সব খবরাখবর মোবাইলে সাথে সাথেই দিয়ে দেয়। তখন আমরা বসে থাকতাম ল্যান্ড ফোনের সামনে। কেউ কোন অভিযোগ বলে শেষ করার আগেই লাইন কেটে যেতো তিনি নেমে গেলেন তাঁর গন্তব্যে। আমাকে যেতে হবে আরো কিছুটা দূর। ইজি বাইকের ভাড়াটা দিয়ে দিলেন তিনি, কিছুতেই নিষেধ মানলেন না। বাবারা মৃত্যুর পরও কেমন আগলে রাখেন স্নেহে ! সামনে দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে চলে গেলো সারিবাঁধা কয়েকটা হাইহেস গাড়ি, পেছনে প্যানাফ্ল্যাক্সের ব্যানার লাগানো- ১ম শ্রেণির বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। কয়েকদফা বিজিবির টহল। একটা দুটা হোন্ডা আটকাচ্ছে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। থানা চত্বরের ভেতরে কয়েকশ ইউনিফর্ম পরা মানুষ। আনসার ভিডিপি। থানার বাইরে রাস্তায় লাইন ধরা লাইটেস। সম্ভবত রিকুইজিশন করা। আনসার ভিডিপি কর্মীরা ছড়িয়ে পড়বে জেলার আনাচে-কানাচে। কানটুপি পরে নাকমুখ ঢেকে বাসায় ফিরছে যে পথচারী তার চেহারা নির্বিকার। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি বিকাল হতেই চায়ের আড্ডা উত্তপ্ত হয়ে উঠবে মার্কায়-মার্কায়। পুরানো হাসপাতালের দেয়ালে কেউ একজন পোস্টার সাঁটছে, সিনেমার। ‘বাংলা মায়ের কসম’। ঠিক দেখলাম তো নামটা ? এইসব নির্বাচন, ডামাডোল কালই সব শেষ। মানুষ আবার ফিরে যাবে নিজস্ব যাপনে, সংগ্রামে। আমার কলেজে বিজিবি ক্যাম্প। মাথায় হ্যালমেট, গায়ে বর্ম, খোলা জিপের মাথায় রাইফেল বেঁধে তারা একদল বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদল ঢুকছে। কাল দেশ প্রবেশ করবে আগামী পাঁচ বছরে....। অনেক তো হলো প্রিয় স্বদেশ। প্রাজ্ঞ ৫০ কড়া নাড়ছে দরজায়। এবার অন্তত স্থিত হও। নির্বাচনের পর আর কোন পূর্ণিমার নাম খবরের শিরোনাম না হোক। না ঘটুক লুটপাট-অগ্নিসংযোগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। প্রিয় স্বদেশ হাঁটুক প্রগতির রাজপথে, সমৃদ্ধি আর অসাম্প্রদায়িকতার উদার ভবিষ্যতে......।

আমার কাব্যপদ্য প্রতিদিন রাতে জিজ্ঞেস করবে, মা সকালে তোমার কলেজ আছে ? আমার উত্তরও প্রতিদিন এক, হ্যা আছে। দু‘জনের একসাথে মন খারাপ। আমি সকালে ওঠে কলেজ চলে যাই। ওরা একা একা খেয়ে পরীক্ষায় যায়, স্কুলে যায়। ক্লাসের সময়টা কাটিয়ে দিলেও পরীক্ষার সময়টাতে অনেক মন খারাপ করে। অন্য অভিভাবকরা সন্তানদের সাথে করে নিয়ে যায়, ঘন্টা পড়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত পাশে বসে থাকে, টিচার ঢুকলে সন্তানের কপোলে শেষ চুমুটা দিয়ে ক্লাস দিয়ে বের হয়। আর কর্মজীবী মা হওয়ার কারণে আমি ওদের স্কুলে পৌছে দিতেও যেতে পারি না। আমার ছেলেটা একটু সরলসিদা টাইপ, কোন কিছু নিজের মতো বুঝে না। যা কিছু অসংগতি মনে আসে কারো মুখের দিকে না তাকিয়ে বলে দেয়। একদিন আমাকে বলেছে, মা শুনো আমারও অন্যদের মতো আদর পেতে ইচ্ছে করে। সবার মা টিফিন পিরিয়ডে ওদের টিফিন খাইয়ে দেয়,পানি খাইয়ে মুখ মুছে দেয়। আমি তখন ওকে কর্মজীবী মা আর হাউস-ওয়াইফ মায়েদের একটা পার্থক্য বুঝিয়েছি। ও বুঝেছে। ওর মনোবেদনাটাও আমি টের পেয়েছি। কিন্তু মোটেই নিজে অপরাধবোধে ভুগিনি। মেয়ে আবার নিজে নিজে অনেক কিছু বুঝে নেয়। এবার বললো, মা অন্তত একদিন আমাকে পরীক্ষার হলে নিয়ে চলো, নইলে সবাই ভাবে তুমি অসচেতন মা, আমার পড়ালেখার দিকে তোমার নজর নেই। এই অভিযোগেও মোটেও বাড়াবাড়ি নেই। ওরা চারপাশে যা দেখে তা থেকেই তো তৈরি হবে মনোজাগতিক প্রত্যাশা। কিন্তু আমি এ নিয়েও অপরাধবোধে ভুগিনা। আমার বাচ্চারা যখন কেজি নার্সারিতে পড়ে, ক্লাসে ফার্স্ট সেকেণ্ড হয়না, মা পরীক্ষার সময় উৎকণ্ঠা নিয়ে স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে থাকি না তখন থেকেই বাকি অভিভাবককুল সহ শিক্ষকদের আমার প্রতি অভিযোগের অন্ত নেই।আমি এসব পাত্তা না দিয়েই চলি। তবে সন্তানদের যখন বুঝাতে হয় তখন ওদের বুঝাই, সময়ের চাকা পেছনের দিকে ঘুরবে না সোনারা। আজ তোমার মা যতোটা সময় ঘরের বাইরে থাকে তোমাদের সময়ে তা বাড়বে ছাড়া কমবে না। তোমাদের কষ্ট এখন আশেপাশে অন্য হাউস ওয়াইফ মায়েদের সন্তানদের সময় দিতে দেখো বলে, তোমাদের সন্তানরা সে কষ্ট পাবে না কারণ তখন সব মায়েরাই এমন ব্যস্ত থাকবে। ভিকারুন্নেছা নুনের ঘটনায় শাস্তি হয়েছে শিক্ষকের। এবার আসুন অভিভাবক হিসাবে নিজের চেহারাটা দেখি। আমরা তো সেই অভিভাবক যারা প্রত্যেকেই চাই, সন্তান ক্লাসে ফার্স্ট হোক ! আমরা তো সেই অভিভাবক যারা সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করার জন্য ডোনেশনের নামে ঘুষ দেই ! আমরা তো সেই অভিভাবক যারা ফাস হওয়া প্রশ্নপত্র সন্তানের হাতে তুলে দেই ! আমরা তো সেই অভিভাবক কোচিং প্রাইভেট টিউটরের চাপে যারা সন্তানের আনন্দময় সময়কে হত্যা করি ! আমরা তো সেই অভিভাবক কাঙ্খিত নাম্বার না পেলে যারা সন্তানকে মানসিক ও শারিরীকভাবে শাস্তি দেই ! আমরা তো সেই অভিভাবক, সমাজে নিজের সম্মান বাড়ানোর জন্য যারা প্রতিনিয়ত সন্তানকে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেই ! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপরে দোষ চাপালেও কিছুটা চলে। সাবধান আপনার নিষ্পাপ পবিত্র সন্তান কিংবা শিক্ষার্থীর উপর দোষ চাপাবেন না। যে শিক্ষার্থী ক্লাসে নকল করছে, তাঁকে আপনি-আমি বার্তা দিচ্ছি যেনতেন ভাবে পরীক্ষায় ভালো করলেই জীবনে সাফল্য আসবে। যে ছেলে অসদুপায় অবলম্বন করে শিক্ষককে চোখ রাঙাচ্ছে সে আপনার আমার মতো কারো সন্তান, যে আপনি আমি তাঁকে লোভী করে তুলেছি। সৎ শিক্ষা দিতে পারিনি। তাঁকে সর্বদা বলেছি "ফার্স্ট" হতে হবে। কখনো "ভালো মানুষ" হতে বলি নি। আমরা প্রত্যেকে সমাজে আমাদের নিজেদের সোকল্ড ‘সম্মান’ আর প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছি। যে শিক্ষার্থী বহিস্কৃত হলো তাঁর দিকে ঘৃণার দৃষ্টি ছুঁড়ে দিতে দ্বিধা করছি না। আমরা মোটেই তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হচ্ছি না। যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পার পেতে যায় যে ঘুণেধরা ব্যবস্থা আসুন তাকে ঘৃণা করি, বদলাতে চেষ্টা করি। আর এই দায়িত্ব আমার,আপনার। আসুন নিজেদের দিকে আঙুল তুলি।

না আজ আমার ছেলে-মেয়েদের জন্মদিন নয়। ওইশ টুইশ মোটেই লাগবে না। মাঝে মাঝে নিজেই জীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির ডেবিট ক্রেডিট যখন মিলাই, পরম স্বস্তিতে আবিষ্কার করি এই একটি প্রাপ্তি ম্লান করে দিয়েছে অন্য সবকটি অপ্রাপ্তি। ওদের তখন তিনবছর হয়নি, মা হওয়ার অভিজ্ঞতা লিখে মেরিলের আয়োজনে পুরস্কৃত হয়েছিলাম সোনারগাঁ হোটেলে এক গ্র‍্যাণ্ড আয়োজনে। এসব কতো অর্জনই যে ম্লান হয়ে যায় ওদের অবুঝ উষ্ণতায়.....। জীবন পূর্ণ হয়ে যাওয়া উষ্ণতা। পা ভেঙে ক্রাচ নিয়ে হাঁটি। কাব্য, ছেলেটা হাত ধরে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। বলি, থাক বাবা লাগবে না। আমিই যাই কষ্ট করে। দুতিনদিন একই উত্তর পেয়ে সে আমাকে বলে, হ্যা মা ঠিক আছে তুমি নিজের চেষ্টায় চলতে চাও ভালো কথা।কিন্তু তোমার কষ্টে আমি যে কিছু করতে পারছি না এতে যে আমার কষ্ট হয় এটা তোমার বুঝা উচিত!  অবাক হয়ে ভাবলাম, তাইতো আমিতো এভাবে বুঝিনি !! ঘরের সহকর্মীকে দেখি প্রায়ই ফ্ল্যাটের নানা খবরাখবর জিজ্ঞেস করে। পদ্য বললো, তুমি তো এটা জানো ভাইয়া ওকে জিজ্ঞেস কর কেনো ? উত্তর দিলো, না কনফার্ম হই। ওতো গুগুল অব দ্যা নেহার ম্যানশন (ফ্ল্যাটের নাম)। আরে আমার মাথায় তো বিবিসি, ভয়েস অব দ্য আমেরিকা ছাড়া আর কোনো সবজান্তার উদহারণ আসে না ! পদ্যর বয়স তখন দুই/আড়াই। জন্মের পর থেকেই দিনব্যাপী ঘুম আর সারারাত জাগার অভ্যাস ওদের। তখন থেকে আমিও ওরা ঘুমালেই জরুরি কাজগুলো সেরে নেয়ার চেষ্টা করি। এমনকি পত্রিকা পড়া পর্যন্ত। একদিন ওকে বলছি পাশের ঘর থেকে পত্রিকা নিয়ে আসতে। জিজ্ঞেস করলো কেন ? বললাম, পড়বো। দুই/আড়াই বছরের পদ্য অবাক হয়ে আমাকে দুনিয়ার বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, মেয়েরা পত্রিকা পড়ে ? জেগে থাকা সময়টুকুতে ওতো আসলে বাবা দাদু ছাড়া মা আর দিদাকে পত্রিকা পড়তে দেখে না। এখন ঘুম থেকে জেগেই চা খেতে খেতে অনলাইনে পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নেই। প্রিন্টিং পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়া হয় কম। ওরাই পড়ে। পদ্যকে সেদিন বলছি, রস আলোটা নিয়ে আয়তো। সে সেই দুই বছরের বিস্ময় নিয়ে বলে, ও বাবা তুমি রস আলোর নামও জানো ! হ্যা তাইতো ! তোদের জন্মের আগে আমার আর কোন জীবন ছিলো নাকি, কিভাবে মানুষ কষ্ট পায় জানবো ! এসব রস আলো টালোর নাম জানবো ! তোরাই তো জীবন দিলি ! কী সুন্দর এই জীবন !

পৃথিবীতে সবচেয়ে সৌভাগ্যের কাজ মনে হয় বাবা মার জন্য কিছু করতে পারা। তেমন কিছু করা, যাতে নিজের তৃপ্তি আর তাদের আনন্দ এক বিন্দুতে মিশে অপার্থিব মূহুর্ত জন্ম নেয়।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আমি আমার বাবা মায়ের জন্য কিছু করতে পারি নি, বিন্দুমাত্র কিচ্ছু না। প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের দুর্ভাবনা আর বেদনার কারণ হয়েছি শুধু। তাদের প্রত্যাশার একবিন্দু পূরণ করতে পারিনি কোনদিন, কোনভাবে।
এখন যখন নানা কারণে কোন ভোগান্তিতে পড়ি, অতিলৌকিক ব্যাখ্যা খুঁজি, কেনো এমন হলো ! বোধহয় এ আমারই কোন কৃতকর্মের ফল। একমাত্র বাবা মাকে দুঃখ দেয়া ছাড়া আর কোন অন্যায় জীবনে খুঁজে পাইনা।
এবার পা ভাঙার পর থেকে প্রতিদিন ইজিবাইক রিজার্ভ করে কলেজ যাই। ভাড়া গুনি প্রায় ৫ গুণ। আসা যাওয়ায় ১০ গুণ। ক্রাচ দুটো পাশে রেখে একা আসি একা যাই। আজ কী মনে করে ড্রাইভারকে বললাম আপনি চাইলে অন্যলোক নিতে পারেন। ভাবলাম তাঁর কয়েকটা টাকা বেশি রোজগার হলে অসুবিধা কী ! তিনিও সুযোগ পেয়ে গাড়ি ভর্তি করে মানুষ তুললেন।
আজই দেখি মা দাঁড়িয়ে আছেন ব্যাংকের সামনে। হয়তো পেনসনের টাকা, বোনাস তুলতে গিয়েছিলেন। প্রচণ্ড ভীড়ে রিক্সা, ইজিবাইক কিচ্ছু পাচ্ছেন না। আমার গাড়ি ভর্তি অপরিচিত লোক। আমি কাকে নামতে বলি ? অথচ গাড়িটি আমার রিজার্ভ করা। প্রতিদিন একা আসি একা যাই। যতোদূর চোখ যায় পিছন ফিরে ফিরে দেখছিলাম মা কিছু পেলেন কিনা! আর ভাবছিলাম, এ নিশ্চই প্রকৃতি নির্ধারিত ভবিতব্য। নইলে আজকেই কেনো আমি ড্রাইভারের উপকার করতে গেলাম ! ঐ যে বাবা-মায়ের জন্য সামান্যতম কিচ্ছু করার সৌভাগ্য আমি নিয়ে জন্মাইনি। ফেসবুকে এসব কেনো লিখি, কেজানে ! তবে ভেতর থেকে বের করে দিলে কিছুটা হালকা হই। এখানেও স্বার্থপর। নিজের দিকটাই দেখি।


উপেক্ষা অযোগ্য ব্যস্ততা আর অনতিক্রম্য আগুছালো দিনের টানাপোড়নের জীবন আমার। কেবল সময়-সুযোগ- অবসর আর গুছানোর স্বপ্নই দেখে গেলাম। আজ পর্যন্ত সবকটার সমন্বয় হলো না কোনোদিন। শৈশবে আমাদের বসবাসের দু কামরার নাম ছিলো ‘বড় ঘর’ আর ‘মাইজম ঘর’। মাইজম ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকতেন আমার পিতামহ, অর্ধাঙ্গ অচল, কলকাতা ইউনিভার্সিটির গ্র‍্যাজুয়েট। আমি তখন গ্র‍্যাজুয়েটের মানে জানতাম না।অভ্যাগত আত্মীয় পরিজনরা উপদেশ দিতো, তোমাকে পড়ালেখা করে অনেক বড় হতে হবে। তোমার দাদা কিন্তু গ্র‍্যাজুয়েট। আমি বলতাম, হ্যা খুব গ্র‍্যাজুয়েট! তাঁর মাথার পাশে একটা বিরাট কাঠের সিন্দুক, অচল প্রহরীর মতো কাঠের সিন্দুকটা পাহারা দেয়া ছাড়া তাঁকে আর কোনো কাজ করতে দেখি নি আমি। দাদার বালিশের নিচ থেকে চাবি নিয়ে সিন্দুকটা খুললেই একটা অপার্থিব স্বর্গীয় গন্ধ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলতো গ্রহ গ্রহান্তরে। মা যখন খুলতেন, আমি চুপি দিয়ে দেখতাম পুরানো তামা-কাসার বাসনপত্র। গন্ধের উৎসের সন্ধান পেতাম না। উপরে থরে থরে সাজানো আচারের বয়াম, কাঠের ফ্রেম আঁটা টেবিল ক্লথ, মা আর পিসি মিলে অবসরে সেলাই করেন “সংসার সমরাঙ্গনে…”। ওলের কাটায় গাঁথা অর্ধসমাপ্ত মাফলার। সংসারের ভার টানা ক্লান্ত বাবাকেও দেখতাম সময়ে সময়ে কবিতাটা আওড়াচ্ছেন। খুব ইচ্ছে ছিলো সেই সিন্দুক খুলে একদিন সুযোগ সময় করে গন্ধের উৎস খুঁজে দেখবো ডুবুরীর মতো। মামার বাড়িতে দেখেছি, স্নানের সময় দীঘিতে মামীদের কারো কানের দুল হারিয়ে গেলে ডুবুরি এসে কয়েক ডুবে ঠিক তুলে আনে দুলটি। সেই সময় সুযোগ জীবনে আর আসেনি, দাদুর মৃত্যুর পর কাঠের সিন্দুকটা হারিয়ে গেলো মনেই করতে পারি না ! অপার্থিব সেই গন্ধের সন্ধানও পাইনি আর ! চিরকাল গুছানো জীবনের স্বপ্ন দেখা এক আগুছালো মানুষ আমি। বেশ হতো যদি এই চিনচিনে গুছানোর ব্যাথাটুকু না থাকতো। সদরে অন্দরে আগুছালো পরিতৃপ্তিতে কাটিয়ে দেয়া যেতো একটা জীবন। কিন্তু ঐ যে স্বপ্ন ! এলোমেলো পড়ার টেবিল রেখে মায়ের বকুনি খেতে খেতে অস্বস্তিতে ঘুমাতে পারি নি ঠিকমতো। চোখ খুলতে না পারা ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবতাম, ঠিক কাল গুছিয়ে রাখবো।পরদিন উটকো ঝড়ের মতো তেড়ে আসা তাড়ায় গুছানো হতোনা আর। পরীক্ষায় গণিতে খারাপ করে ভেবেছি পরের বার বছরের শুরু থেকেই এমন ধারাবাহিক মনোযোগে লেগে থাকবো আর খারাপ নাম্বার ওঠার সুযোগই দেবোনা। বছর শেষে দেখি গেলোবারের চেয়ে আগাইনি এক কদমও ! এখনো কলেজ যাবার সময় জামা পাইতো সালোয়ার পাইনা, সালোয়ার পাইতো ওড়না নাই। প্রতিদিন ভাবি একটু সময় পেলেই সব ঠিকঠাক করে রাখবো। ত্রস্ত জীবনের দৌড়ে সে সময়টুকু আর হয়ে ওঠে না ! লেখাগুলো নিয়ে তীব্র খুঁতখুঁতানি নিয়ে ভাবি শক্ত কলম চালাবো এবার, কেজো পৃথিবীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আকণ্ঠমগ্ন হবো লেখায় ,না সন্তুষ্ট হবার মতো একটা লেখাও হয়ে ওঠে না কিছুতেই। এই আগুছালো জীবন আজ যেখানে দাঁড় করিয়েছে, সেখানে তাকিয়ে দেখি না ঘরকা না ঘাটকার এক অতৃপ্ত জীবন বহন করে চলেছি কেবল। এই জীবনের না আছে বৈষয়িক নিশ্চিন্তি না আছে মানসিক শান্তি। যতো নষ্টের গোড়া তো ঐ স্বপ্ন ! না পেলাম গন্ধের উৎস না পেলাম মূল্যবান দুলের সন্ধান। বেশ হতো যদি স্বপ্নটাই না থাকতো ! কতো মানুষই তো স্বপ্নহীন নির্বিকার জীবন কাটিয়ে দেয়, কী আসে যায় পৃথিবীর !


এ জাতীয় আরো খবর