মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২, ২০১৯

সকল আরাধনার মূল হচ্ছে অচ্যুত আরাধনা : পাঠকসম্রাট নিত্যগোপাল গোস্বামী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০১৯-০৯-১৬ ১০:০৯:১৬
image

ডেট্রয়েট :  শ্রীমন্নিত‍্যানন্দ বংশাবতংস পাঠকসম্রাট প্রভুপাদ শ্রীল নিত্যগোপাল গোস্বামী ভাগবতাচার্য‍্য বলেছেন, আপনার ঠাকুর মন্দিরে সব আছে, কিন্তু মজার কথা পূজা দেবার সময় নেই। একজনকে পূজা দিতে পারেননা, ডেকে এনেছেন অনেকগুলো দেবদেবী।  সিংহাসনে জায়গা হয়না। আজকাল কাজের মেয়ে নিয়োগের সময় থালা বাসন মাজার সাথে পূজা করতে হবে এমন শর্তও দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ এই কাজের মেয়ের কান শুদ্ধির জন্যও অনুরোধ করে থাকেন।
তিনি গত ৮ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যায় ডেট্রয়েট দুর্গা টেম্পলে শ্রীশ্রী হরিভক্তি প্রচারিণী সভা মিশিগান শাখা আয়োজিত ধর্মালোচনা সভায় বক্তব্য রাখছিলেন। এর আগের দিন ৭ সেপ্টেম্বর শনিবার তিনি ওয়ারেন সিটির মিশিগান কালিবাড়িতে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা ও কীর্তন পরিবেশন করবেন । দুদিনের এই ধর্মালোচনায় শত শত ভক্তবৃন্দ পিনপতন নীরবতায় তাঁর বক্তব্য শ্রবন করেন। এছাড়া এখানে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি ওয়ারেন সিটির বাসিন্দা সুখেন্দু রায়ের  ৩১৩০৫ ডেসমন্ড ড্রাইভ রোডস্থ বাসভবনে  প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তকে দীক্ষা দান করেন।

তিনি বলেন, পূজা যে হচ্ছেনা, তা নয় পূজা হচ্ছে। এবার ঠাকুর পূজার নমুনা কি ? পূজা কি বস্তু গৃহস্বামীই হয়তো জানেনা। শেখার ইচ্ছা নেই। লাইন দিয়ে ফুল দিয়ে দেয়া। গুরুদেব বৈষ্ণব হলে তার বুকে বা চোখে তুলসী দেয়া। তুলসী বুকে পড়বে না চোখে পড়বে তা দেখারই সময় নেই। পরে কাজ আছে তো। এই হচ্ছে পূজা। ছোট একটা থালার মধ্যে গুণে ২টা বাতাসা নয়তো ৬টা নকুল দানা। ৮টা পড়লে আবার ২টা বোতলে চলে যায়। ঠাকুরের কপালটা বিচার করুন। যে আপনার কপাল ফিরাবে তার কপালটা বিচার করুন। যদি ঠাকুরের কৃমি হতো তাহলে যে কি হতো। ভাগ্য ভালো ঠাকুরের কৃমি হয়না। যেদিন থেকে ঠাকুর ঘর আরম্ভ করেছেন  সেদিন থেকে নকুলদানা বাতাসা, নকুলদানা বাতাসা খেয়ে খেয়ে প্রাণটা শেষ। আবার ডায়বেটিসও হয়না- এটাও একটা কথা। তাহলে আবার ঠাকুরকে ইনসুলিন নিতে হতো। খুব মুশকিলের কথা। তারপরে আবার জলটা কি এইটুকু গ্লাস। তৃষ্ণাতেও এক ঢুক জল হয় না। ২০/২৫ জন ঠাকুর বসিয়ে দিয়েছেন এইটুকু জল। পরিস্থিতিটা বুঝুন। একজনের পূজা ঠিকমত করতে পারেন না। আপনি আপনার নিজের কল্যাণের আশাতে কতজনকে ডেকে এনেছেন। তাদের ডেকে এনে কত কষ্ট দিচ্ছেন। পাপ আপনার হবে। সে তো আসতে চায়নি। গায়ে পড়ে তো আসেনি। আপনি ডেকে এনেছেন। আপনার আহ্লাদ হয়েছে। মনে হয়েছে কল্যাণ হবে। সেই কল্যাণের আশাতে আপনি তাদেরকে সসম্মানে আপনার ঠাকুর ঘরে ডেকে এনে  ঢুকিয়েছেন। এবং যেই ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করিয়েছেন, সাথে সাথে একটা প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তোমাকে ঠাকুরের আসনে রাখলাম। তোমাকে ঠাকুরের মর্যাদা দিলাম। ঠাকুরের মর্যাদা তো আর বলে শেষ নেই।

তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশে ঠাকুরের কত দুর্গতি। পূজার সময় কত লাফালাফি। পুজা শেষ কষ্ট করে বিসর্জন দেয়া হলে তো ভাল, নয়তো লাইট পোষ্টে কিংবা গাছের তলায় ফেলে রাখা হয়। চুল খসে পড়ছে, কাপড় খসে পড়ছে। কেউ খাবারও পায়না। এখন চিন্তা করে দেখুন কল্যাণটা যে হবে কোথা থেকে হবে। কল্যাণটা হচ্ছে তো। কিভাবে আপনার প্রশান্তি হবে, আপনার ভাল হবে। কারণ যথাযথ ভাবে দেব দেবীকে সম্মান বা পূজা সম্পন্ন না হওয়ায় কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বয়ে আনছে। আর তাই তো আজ চারদিকে হতাশা, অভিযোগ। এটা হয়নি ওটা হয়নি। হবে কিভাবে।  তুমি তো হওয়ার মতো ব্যবস্থা করনি। সুতরাং এতো দেব দেবী আনার আগে চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, আপনি যে আরাধনাই করেন না কেন যদি কৃষ্ণ চরণে রতিমতি, প্রেমভক্তি  না থাকে  জানবেন আপনার সেবা পূজা প্রচেষ্টাই ত্রুটিযুক্ত হয়ে থাকে।

পাঠকসম্রাট নিত্যগোপাল গোস্বামী বলেন, জীবনে এমন বহু দেখা যায় নিজের যোগ্যতায় সে হয়তো পরিশ্রম করে বড় হয়েছে, আবার ফকিরও হয়ে গেছে নিজের ভুলে। এখানেই বিচার্য বিষয়। যোগ্যতাটা যদি তারই হলো তাহলে সে পেলই বা কি করে আবার  হারালোই বা কি করে। প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু যদি কৃষ্ণ চরণে আপনার রতিমতি না থাকে ভগবানের কৃপা বর্ষণ যদি না করতে পারেন তাহলে কিন্তু আপনার শ্রেষ্ট প্রাপ্তি সম্ভব নয়। সুকর্মের ফলে আজকের দিনে আছেন। আমেরিকা এসে যদি আপনার মনে হয়, হয়ে গেছে তো আবার কি ? সিদ্ধি লাভ করে ফেলেছি, তাহলে বিরাট ভুল করছেন। আবার অন্য জন্মে যেতে হবে। সেখানে আবার ভালো থাকতে হবে। আপনার কর্ম আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে আপনি জানেন না। আপনার যদি ওই রতিমতি না থাকে কৃষ্ণ চরণে যদি করুণা প্রাপ্তি না থাকে আবার গিয়ে কোথায় উপস্থিত হবেন সে খবর কেউ জানে না। 
শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। শ্রীকৃষ্ণ বললেন শোন আমি বিনে গতি নাই। তোমার যত খুটিনাটি  আছে সমস্ত ত্যাগ কর। কৃষ্ণ চরণে তুমি মনপ্রাণ সমর্পণ করো। তাহলে কি হবে এতে তুমি প্রথম যে ফলটি লাভ করবে এটি হলো তুমি যে পাপই করে থাক না কেন, তোমার যত দুষ্কর্ম থাকুক না কেন সমস্ত পাপ থেকে তুমি মুক্তি লাভ করবে।  চিন্তা করো না আমি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করছি- আমার বাণীতে তুমি ভরসা রাখ। এতে প্রথম প্রাপ্তি কি ? যে দুষ্কর্ম আমি করে এসেছি তা থেকে মুক্তিলাভ। জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতেসারে ভুল হতেই পারে। ভগবান তিনি তার ভক্তের গুণ দেখতে ভালবাসেন। তিনি এতো একটা দোষ দেখেন না। দ্বিতীয় কৃপাটা কি যারা অনন্যমনা হয়ে অনন্যমনা বলতে যে মনে কৃষ্ণ বিনে অন্য গতি নেই এই  ভাবটা আছে। খুব তাৎপর্যপূর্ণ কথা। আমরা দুর্গা মন্দিরে বসে যদি একথা বলি তাহলে যারা মন্দিরের প্রতিষ্ঠায় জড়িত কিংবা মন্দিরের সাথে যুক্ত  তারা মনে করতে পারেন তাহলে আমরা মন্দির স্থাপন করে কি  ভুল করেছি। না। কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান।
তার চরণে রতিমতি রেখে তুমি যা কিছু করো এতে দোষ নেই। কিন্তু কৃষ্ণ বিনে স্বতন্ত্র ঈশ্বর চিন্তা, তাহলে কিন্তু ভুল হয়ে গেল। তার কারণ কি ? গাছের গোড়ায় জল না দিয়ে লতাপাতা, ডাল, ফুলে ফলে জল দিলে সেই জল লতাপাতা ফলে ফুলে পৌছায় না। জল দিতে হবে গোড়াতে। মূলেতে যদি জল সেচ করা যায় তখন শিকড়  ফুল ফল পাতা সবই পুষ্ট হয়। ঠিক সেই রকম যত যত আরাধনা আছে, অর্জন আছে, সাধনা আছে- সমস্ত আরাধনার মূল হচ্ছে অচ্যুত আরাধনা। অর্থাৎ কৃষ্ণ আরাধনা। 
স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, কর্মফলের দ্বারা উন্নতি বা কুকর্মের ফলে অবনতি এটা শুধু মানুষেরই হয়। আপনি হয়তো অনেক অর্থ উপার্জন করলেন। অনেক প্রতিষ্টা অর্জন করলেন। কিন্তু আপনার হৃদয়ে প্রশান্তির অনুভূতি যদি না থাকে তাহলে তাহলে জানবেন আপনার সব পাওয়া বৃথা হয়েছে।  

পাঠকসম্রাট নিত্যগোপাল গোস্বামী তার আসনে বিদ্যুতিক মোমবাতি প্রত্যক্ষ করে বলেন, এটা ভগবানেকে ঠকানোর ভাল মাধ্যম। তিনি বলেন,পুজা অর্চনায় মোমবাতি বৈধ নন। একটু কষ্ট করে তুলো পেছিয়ে নিন। এতো শর্টকাট ভাল না। আমাদেরকে প্রদীপ নির্মাণের পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এই প্রদীপ নির্মাণে ঘৃত এবং তৈল প্রশস্থ। তবে সব তৈল নয়। যদি মোমবাতি দেয়া যায়, তাহলে তো শুয়োরের চর্বিটাও দেয়া যায়। যদি তাই হয় তাহলে আর প্রদীপের দরকারটা কি? বড় বড় খবরের কাগজ পাকিয়ে আগুন লাগান, দেন আরতি। আগুনটা শেষ কথা নয়, আগুনটা বৈশিষ্টপূর্ণ নয়, আগুনের নির্মাণটা বৈশিষ্ট। ৩টি বস্তু একত্রিত হলে প্রদীপ হয়। বস্তু ৩টি হলো সলিতা, তৈল বা ঘৃত ও ধাতব আধার।


এ জাতীয় আরো খবর