মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ৭, ২০২৩

হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাট

  • সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :
image

ঢাকা, ২২ জানুযারী : বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ, পাটের সবুজ পাতায় দোল খায় কৃষকদের সোনালী স্বপ্ন। বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল পাট। পাট থেকে তৈরি নানান পণ্য রপ্তানি করে প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করে। শত বছর ধরে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ চাষী বাণিজ্যিকভাবে পাট চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাটকে ঘিরে স্বপ্নের জাল বোনেন বহু কৃষক। তাই তো পাটকে বলা হয় সোনালি তন্তু। কৃষকরা তীব্র গরম আর ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাট ক্ষেতের মাঠে ব্যস্ত সময় পার করেন। কখনো বা অতিবৃষ্টিতে কৃষকদের ভয় লাগে, আবার কখনো বা সেই বৃষ্টি কৃষকদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। দ্রুত বেড়ে ওঠে পাট গাছ। বাংলাদেশের বহু কৃষকের ভালো থাকা নির্ভর করে এই পাট চাষের উপর। তারা তাদের সর্বোচ্চ শ্রম দেন পাট চাষে। গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের পাট বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করেছে। তবে দেশটির সেই ঐতিহ্য আজ কিছুটা হলেও ম্লান।
কৃষি প্রধান দেশ বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা বাংলাদেশের পলি প্রধান মাটিতে পাট খুব দ্রুত বেড়ে ওঠে। পাট মূলত তন্তু জাতীয় দ্বিবীজপত্রী গাছ। বর্ষাকালে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আদ্রতা আর পরিমিত পরিমাণে বৃষ্টি পেলেই পাটগাছ ভালো হয়। কৃষকরা রোদ বাদলা উপেক্ষা করে সারাদিন পাটের জমিতে কাজ করেন। বাংলাদেশের পাট বিশ্ব বিখ্যাত। এই পাটের সঙ্গে মিশে রয়েছে বাংলাদেশের কৃষকদের রক্ত জল করা পরিশ্রম, ভালোবাসা আর নানান স্বপ্নের বুনন। দুঃখের বিষয় হল, ধীরে ধীরে বাংলাদেশে পাট চাষের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। বিরাট ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। পাট চাষ করলেও যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন না। মাঝেমধ্যেই কৃষকরা পাট নিয়ে মহা বিপাকে পড়েন। উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে ডিজেল, সার, শ্রমিকের মজুরি, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, সেচ প্রভৃতির খরচ। এছাড়াও শ্রমিকের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লক্ষ একর জমি থেকে প্রতিবছর ৯ থেকে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়। অধিকাংশ পাট চাষ হয় টাঙ্গাইল, ঢাকা, যশোর, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকা গুলিতে।
বাংলাদেশের বহু কৃষক আছেন যারা পাট বিক্রির টাকা দিয়ে সারা বছর সংসারের খরচ মেটান। সেই টাকা দিয়ে আমন ধানের আবাদ করেন, আবার কেউ বা আশ্বিন কার্তিক মাসে জমির লিজ নিয়ে চাষ করেন। সেক্ষেত্রে পাট চাষেই যদি ক্ষতি হয় তাহলে সমস্যা হবে বহুমাত্রিক। পাট চাষ সম্পূর্ণ নির্ভর করে বৃষ্টির উপর। যদি দীর্ঘ খরা বা বৃষ্টি বাদলের দেখা না মেলে তাহলে ফলন ভালো হবে না। পাট বোনার পর যদি একবার কচি চারাতে কাটুই পোকার আক্রমণ হয়, তাহলে সেই কৃষকের মাথায় হাত। পাট চাষের জন্য খাল বিল নদী নালায় যথেষ্ট পরিমাণে জলের প্রয়োজন। কারণ জল না থাকলে পাট কাটার পর জাগ দেওয়া যাবে না। যেহেতু ডিজেলের দাম বাড়ছে তাই শ্যালো মেশিনে জল তুলতে বাড়তি খরচ পড়ছে। এখন নিয়মিত বর্ষা পাওয়া বেশ মুশকিল, আগে নিয়মিত বর্ষা হত তাই পাট খেতেই জাগ দেওয়া যেত। এখন সেখানে পচা জলে গাদাগাদি করে পাট পচানোর ফলে রং হয়ে যাচ্ছে কালচে। এই সমস্যায় রয়েছেন বাংলাদেশের বহু পাট কৃষক।
মূলত পাট চাষের জন্য উষ্ণ জলবায়ু আর প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। পাট বোনার উপযুক্ত সময় ফাল্গুন আর চৈত্র মাস। পাট গাছ কেটে ছোট ছোট করে আঁটি বাঁধা হয় শ্রাবণ ভাদ্র মাসে। আঁটি গুলি জলে ভিজিয়ে রাখা হয়, যাকে বলা হয় জাগ দেওয়া। দীর্ঘদিন জলে থাকার পর পাটের আঁশ পচে নরম হলে সেই আঁশ ধুয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। সেই আঁশকেই বলা হয় পাট। আর ভিতরের কাঠিকে বলা হয় পাটকাঠি। পাট থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। যেমন সুতো, বস্তা, কাপড়, দড়ি ,কার্পেট, বিভিন্ন ঘর সাজানোর সৌখিন জিনিস প্রভৃতি। আর পাটকাঠি ব্যবহার করা হয় জ্বালানির কাজে, বেড়া, কাগজ, চারকোল তৈরিতে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পাটের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় দেশটির সরকারি এবং বেসরকারি পাটকল গুলিতে। বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে পাট চাষের সঙ্গে। পুরুষের পাশাপাশি বহু মহিলারাও পাট চাষের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন। পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বেশি পরিবেশবান্ধব ভেজিটেবিল ফাইবার হল পাট। যা উৎপাদনে বহু গুণে এগিয়ে বাংলাদেশ।
উনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে পাট একটি মহার্ঘ্য অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। আবাদের সূচক পাট গাছের জন্য তরতরিয়ে উপরে ওঠায় এর ডাক নাম হয়ে যায় সোনালী আঁশ। কিন্তু সেই সোনালী আঁশের গুরুত্ব এবার কমছে। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। গোটা বিশ্বের মানুষ এখন ঝুঁকেছে অপচনশীল কৃত্রিম তন্তুর দিকে। অপরদিকে পাট চাষে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু চাষিরা বিক্রির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। যার কারণে ইতিমধ্যেই যশোর অঞ্চলের প্রায় ছয় জেলায় পাট চাষে উৎসাহ হারিয়েছেন কৃষকরা। বছরের পর বছর কৃষকরা যদি পাট চাষের লোকসান করতে থাকেন তাহলে তারা যে চাষ করবেন না এটাই স্বাভাবিক। পাট চাষ ঘিরে কৃষকদের যে স্বপ্ন তা দিনের পর দিন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। যদিও এই চিত্র বাংলাদেশের সর্বত্র নয়, তবে অধিকাংশ জায়গায় হারিয়ে যাচ্ছে পাট চাষের ঐতিহ্য।
সূত্র : ।। প্রথম কলকাতা ।।

 

 

 


এ জাতীয় আরো খবর