রবিবার, ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২১

ভার্চুয়ালি পালিত হলো বিশ্ব হিজাব দিবস

  • ফারজানা চৌধুরী পাপড়ি :
image

ওয়ারেন, ১ ফেব্রুয়ারি : হিজাব একটি আরাবী শব্দ এর অর্থ আবৃত রাখা। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে এমন অংশকে ঢেকে রাখাকে হিজাব বলে। আজ ১ ফেব্রুয়ারি পালিত হলো ‘বিশ্ব হিজাব দিবস’। 
২০১৩ সাল থেকে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। সেই থেকে হাজারো মুসলিম, অমুসলিম নারী হিজাব পরে দিবসটি পালন করেন। বিশ্ব হিজাব দিবস সম্পর্কে অনেকেই হয়তো তেমন কিছু জানেন না।’বিশ্ব হিজাব দিবস’ উদযাপনের চিন্তাটা প্রথমে আসে যুক্তরাষ্ট্র নিউইয়র্ক রাজ্যের বাসিন্দা নাজমা খান নামে এক নারীর মনে। নাজমা খানের জন্ম বাংলাদেশে হলেও তিনি দীর্ঘ বছর ধরে নিউইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। নিউইয়র্কের ব্রুনেক্সে বেড়ে ওঠা হিজাবি নারী নাজমা খান অল্প বয়স থেকেই ধর্মীয় বৈষম্যের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত। নাজমা খান ১১ বছর বয়সে বাবা-মার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হন। তিনি যখন হিজাব পরে স্কুলে যেতেন, তখন অনেক অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হতো। কলেজ জীবনেও ক্রমাগতভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার পর এই উৎপীড়ন নতুন আরেকটি স্তরে পৌঁছায়। আল জাজিরাকে তিনি বলেছিলেন, প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটার সময় তাকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো। মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময় ‘ব্যাটম্যান’ এবং ‘নিনজা’ বলে ডাকতো অনেকে। আর নাইন ইলেভেনে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ‘লাদেন’, ‘সন্ত্রাসী’ ইত্যাদি আখ্যা দেয়া হতো। তাকে পেছন থেকে ধাওয়া করা হতো, শরীরের ওপর থুতু ফেলতো, পুরুষেরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতো।’ হিজাবের কারণে একই ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া অন্যান্য মুসলিম নারীদেরকে একত্রিত করতে নাজমা খান তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার আহ্বান জানান। নাজমা খান বলেছিলেন ‘তাদের শেয়ার করা গল্পগুলো পড়ার সময় নিজের সংগ্রামের দৃশ্য আমি আমার বোনদের মধ্যে দেখতে পাই।’ এসব ঘটনা তাঁকে খুব বেশি আহত করে। এরপর তিনি ‘বিশ্ব হিজাব দিবস’ চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। হিজাবকে শুধু মুসলিমদেরই পোশাক মনে করেন না নাজমা। তাঁর মতে, হিজাব মূলত শালীনতার জন্য পরা হয়। এই পোশাক পরতে কোনো সমস্যা নেই। তাঁর কথায় সাড়া দিয়ে অনেক অমুসলিম নারীও দিবসটি পালনে এগিয়ে আসেন। নাজমার মতে, মানুষের পোশাক ও বেশ দেখে তাকে বিচার করা ঠিক নয়- এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য হিজাব দিবস একটি মোক্ষম সুযোগ। অমুসলিম নারীরা যদি মাত্র এক দিনের জন্যও হিজাব পরেন, তাহলে মুসলিম নারীদের আর এ ধরণের বৈষম্যের শিকার হতে হবে না বলেও মন্তব্য তাঁর।

ছবি : সমাজ সেবিকা সেলিনা খান, মিশিগান।

হিজাব আজকাল বাংলাদেশ সহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই মুসলিম মেয়েদের জন্যে কেবল একটা ফ্যাশনের নতুন ধারা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই দিবসের মাধ্যমে ইসলামে পর্দার বিধানের যে গুরুত্ব, পর্দার প্রকৃত ধারনা এবং চেতনাকে খুব একটা প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। তবে এই দিবসের মাধ্যমে নাজমা খান অনেক মেয়ের মনেই হিজাবের গ্রহনযোগ্যতা সম্পর্কে কিছু আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যা আমেরিকা, নাইজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মত পাশ্চাত্যের দেশগুলোর জন্যে আশাব্যাঞ্জক। অনেক অমুসলিম নারীও এখন হিজাব পরিধান করছেন। চ্যাটিং বিষয়টা এখন ইমোজি ছাড়া অসম্পূর্ণ। কিন্তু ২০১৭ সালের আগেও পদানশীন নারী বুঝানোর মতো কোন ইমোজি ছিল না। ওই বছরের ১৭ জুলাই ছিল বিশ্ব ইমোজি দিবসে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপেল নিয়ে আসে নতুন ইমোজি ‘হিজাব পরা মহিলা’। ওই বছর নভেম্বরে ‘অ্যাপেল’ হিজাব পরা মহিলার ইমোজি তৈরির অনুমোদন পায় ‘ইউনিকোড’ নামের আরেকটি আন্তর্জাতিক সাহচর্যের থেকে। এই হিজাবটির ক্যাম্পেন করে জার্মানিতে বসবাসকারী ১৫ বছরের এক সৌদি আরবের ছাত্রী। হিজাবি নারীর ইমোজিকে নাজমা খানের আন্দোলনের ফসল বলে মনে করেন অনেকে। 
প্রতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে নাজমা খানের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে (ডব্লিউএইচডি’ বিশ্বব্যাপী মুসলিম নারীদের সঙ্গে সংহতি  প্রকাশ করে একদিনের জন্য হিজাব পরিধান করার জন্য সকল ধর্ম, বর্ণ, পটভূমি এবং জাতি গোষ্ঠীর নারীদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। করোনা মহামারির কারণে এবার দিবসটি ভার্চুয়ালি উদযাপিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমাদের গর্বকে আপনার কুসংস্কার বানাবেন না। হিজাবভীতি বন্ধ করুন।’ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন ১৪০টিরও বেশি দেশে হিজাব দিবস পালিত হয়। এ বছরের ওয়ার্ল্ড হিজাব ডেতে (বিশ্ব হিজাব দিবস) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পেশার নারী অতিথিদের নিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়েছে। মাজেদা-এ-উদ্দিন এর উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়ালে অংশ নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক বক্তা, লেখক, সমাজসেবক সহ আরো অনেকে। মুসলিম নারীদের জন্য হিজাব পরিধান একটি আবশ্যকীয় বিধান। 
এ কর্মসূচির প্রবক্তা বাংলাদেশি এ্যাক্টিভিস্ট মাজেদা-এ-উদ্দিন বলেন, কয়েক বছর আগে নাজমা খান নামক এক বাংলাদেশি ছাত্রী জ্যামাইকায় আক্রান্ত হন। বাংলাদেশি পোশাকে তিনি পথ পাড়ি দিচ্ছিলেন বলেই বিদ্বেষমূলক আচরণের কবলে পড়েন। সেই ঘটনার প্রতিবাদ, নিন্দা এবং সর্বসাধারণকে সচেতন করার লক্ষ্যে শুরু হওয়া হিজাব দিবস এবারও উদযাপিত হলো ঐ একই চেতনায়। কারণ এখনও ধর্মীয় পোশাক, জাতিগত কারণে বৈষম্যের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে সর্বত্র। মাজেদা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার খর্ব করার বিরুদ্ধে নিরবতা অবলম্বনের সুযোগ নেই। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। হিজাব দিবসে সে সুযোগ দেয় সকল অধিকার সচেতন মানুষকে। আপনি কোন ধর্মের-বর্ণের-গোত্রের, সেটি বড় কথা নয়, আপনি একজন মানুষ- এ চেতনায় আমরা জড়ো হয়েছি আজকের হিজাব দিবসের কর্মসূচিতে।
মাজেদা বলেন, আমরা নিউইয়র্ক স্টেট পার্লামেন্টে ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’র দাবি জানিয়েছিলাম। ২০১৬ সালে সে বিল উঠিয়েছিলেন স্টেট সিনেটর রোকসানা জে পারসুয়াদ। সেটি পাশ হওয়ার পর সেখানে এটি জাতীয় দিবসের মর্যাদা পেয়েছে।
হিজাব দিবসের সাথে ইতোমধ্যেই সংহতি প্রকাশ করেছেন ৪৫ দেশের ৭০ জনের অধিক রাষ্ট্রদূত, খ্যাতনামা রাজনীতিক, স্কলারসহ টাইম ম্যাগাজিন, সিএনএন-এর মত বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম। এবারের হিজাব দিবসের স্লোগান হচ্ছে, ‘হিজাব ইজ মাই ফ্রিডম’, ‘হিজাব ইজ মাই প্রটেকশন’, ‘হিজাব ইজ মাই চয়েস’, ‘হিজাব ইজ মাই কভার’ ইত্যাদি। এদিকে মিশিগান থেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন সমাজ সেবিকা সেলিনা খান। তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মে হিজাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা মনে করেন, হিজাব হচ্ছে মর্যাদার প্রতীক। এর পরও যুক্তরাষ্ট্রে হিজাব পরাটা একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। এখানে হিজাব পরে কর্মস্থলে যাওয়া যায় না, হিজাব পরলে চাকরি হারানো আশঙ্কা থাকে। এমনকি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরে যাওয়ার বিধান নেই। এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিশ্ব হিজাব দিবস ভূমিকা রাখতে পারে। সেলিনা খান বলেন, তিনি এবং তার বন্ধুরা যখন হিজাব মাথায় স্কুলে যেতেন, তখন তাদেরকে অনেক অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হতো।  


এ জাতীয় আরো খবর