রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

জগতজ্যোতি দাস, বীর বিক্রম; এক বিস্মৃত প্রায় মুক্তিযোদ্ধার উপাখ্যান

  • সানি চন্দ্র বিশ্বাস :
image

লাখাই, (হবিগঞ্জ) ২৬ এপ্রিল  : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জগতজ্যোতি দাস, বীরবিক্রম। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ( চূড়ান্ত বিজয়ের ১ মাস আগে )   পাকিস্তানি হায়েনাদের সাথে সম্মুখ সমরে বীরদর্পে যুদ্ধ করে দেশমাতৃকার জন্য শহীদ হন। মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের উপর যেভাবে পৈশাচিক তান্ডবে নরপশুরা মেতেছিল সেই  ইতিহাস অনেকের কাছেই অজানা। 

১৯৪৯ সালের ২৬শে এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জগতজ্যোতি দাস শ্যামা। জিতেন্দ্র দাস ও  হরিমতী দাসের কনিষ্ঠ পুত্র জগতজ্যোতি দাস ওরফে শ্যামা। ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন সুনামগঞ্জ কলেজে এবং যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নে (মেনন গ্রুপে)। তেজোদীপ্ত, বিপ্লবী এই অসম সাহসী যুবক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিশেষ দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে চলে যান ভারতের গৌহাটিতে। সেখানে বিভিন্ন ভাষা ও অস্ত্র চালনার বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এর কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২১ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য মেঘালয় রাজ্যের ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে যান। সেখানে অ্যামবুশ থেকে বাঁচার কৌশল, গ্রেনেডিং থ্রোয়িং,শত্রুর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের পর যোগ দেন ৫নং সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর নেতৃত্বাধীন সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনা ভাটি  অঞ্চলে। পরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর-টেকেরঘাট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ফায়ারিং স্কোয়াড 'দাস পার্টি'র কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি ঘটে। দাস পার্টির অফিসিয়াল দলিল ছিল এবং এটি একটি স্বীকৃত গেরিলা বাহিনী। একের পর এক গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে  নিজেদের চৌকস বাহিনী হিসেবে পরিগনিত করে সাড়া ফেলে দেয় সমগ্র  ভাটি অঞ্চলে।  পাকিস্তানিদের কলজে পানি করে করে দেওয়া এক আতঙ্কের নাম দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জগতজ্যোতি দাসের নেতৃত্বাধীন দাস পার্টি। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক, শাল্লা, দিরাই,তাহিরপুর, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ছিল তাদের অপারেশন এলাকা। মাত্র ৩৬ জন গেরিলা সদস্য নিয়ে দাসপার্টি প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল। ভৈরব-সুনামগঞ্জ নৌপথ ছিল পাকিস্তানিদের লজিস্টিকস সাপ্লাই রুট। দাসপার্টির অব্যাহত অভিযানের মুখে পাকিস্তানিরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নৌ চলাচল বন্ধ ঘোষণা  করতে বাধ্য হয়েছিল। 


জগতজ্যোতি যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে দিরাই, শাল্লা, রানীগঞ্জ, কাদিরগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে অসংখ্য রাজাকারদের আটক করেন। গেরিলা যুদ্ধবিদ্যায় তিনি ছিলেন পারদর্শী। ১৯৭১ সালে ১৬ই অক্টোবর পাকিস্তানিদের বার্জ ধ্বংস করে পানিতে নিমজ্জিত করা, পাহাড়পুর অপারেশন, বানিয়াচংয়ে কার্গো বিধস্ত, বানিয়াচং থানা অপারেশন ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য অপারেশন। জগতজ্যোতি দাস একক চেষ্টায় একটি মাত্র হালকা মেশিনগান নিয়ে জামালগঞ্জ থানা দখল করেন। তাছাড়া মাত্র এক সেকশন ( ১০-১২জন) যোদ্ধা নিয়ে তিনি শ্রীপুর, খালিয়াজুড়ি শত্রুমুক্ত করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ই নভেম্বর, ন্যাশন্যাল গ্রিডের বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংসের জন্য ৩৬ জনের দল নিয়ে খালিয়াজুড়ি থেকে বাহুবলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে বদলপুর নামক স্থানে জেলেদের কাছ থেকে রাজাকাররা চাঁদা আদায় করার কথা শুনে তাৎক্ষণিক নৌকা থামিয়ে রাজাকারদের উপর হামলে পড়েন। দুই তিনজনকে হত্যা করে বাকিদের ধাওয়া করলে তারা নৌকা নিয়ে জলসুখা গ্রামে পলায়ন করে। নিজের গ্রামে রাজাকারদের ধাওয়া করতে গিয়ে তিনিসহ ১২ জন যোদ্ধা পাকিস্তানিদের পূর্ব পরিকল্পিত ফাঁদে পা দেন। ফলে  মূল দলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সামান্য রসদ নিয়ে বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন অনেক রাজাকার ও পাকিস্তানি হত্যা করেন। একটা সময় তার দল ১২ জন থেকে  ছোট হয়ে দুইজনে ঠেকে। টিকে রইলেন জগতজ্যোতি ও ইলিয়াস। শত্রুর একটা গুলি ইলিয়াসের পেটের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সহযোদ্ধার ক্ষতস্থান গামছা দিয়ে বেঁধে বলে নিরাপদ চলে যেতে। কিন্তু ইলিয়াস পিছপা হননি আহত অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। দুজনে অপেক্ষা করছিলেন হয়তো সন্ধ্যা হলে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে  চলে যেতে পারবেন। কিন্তু সন্ধ্যার প্রহর পার করার পূর্ব মূহুর্তে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে 'আমি যাইগ্যা' বলে জ্যোতি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ইলিয়াস সহযোদ্ধার নিথর দেহ বিলের কাদায় যতটুকু সম্ভব লুকিয়ে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনেন। পরেরদিন ঐ স্থানে থেকে মৃত লাশ ভেসে উঠলে স্থানীয় রাজাকাররা আজমিরীগঞ্জ বাজারে নিয়ে পেরেক দিয়ে কাঠের মধ্যে বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখে। তার মৃতদেহের উপর থুথু নিক্ষেপ করে এবং প্রচার করে সে ভারতের দালাল, গাদ্দারের লাশ। ক্ষত-বিক্ষত  দেহ সৎকার না করে  অবশেষে ভাসিয়ে দেওয়া হয় কুশিয়ারা নদীর জলে। দাসপার্টি  ও জগতজ্যোতি পাকিস্তানি ও রাজাকারদের কাছে ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিও সহ বিভিন্ন গণমাধ্যম তার বীরত্ব গাঁথা প্রচার করে সগৌরবে।  দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে তাকে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়  (১৯৭৩ সালে গেজেট প্রকাশ)।  মুক্তিযুদ্ধের স্বল্প সময়ে যার নেতৃত্বে এতগুলো বীরত্বপূর্ন সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেই জগতজ্যোতি দাস মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন এবং দেশের তরে ছিলেন  নিবেদিত প্রাণ। বিজয়ের ঠিক একমাস পূর্বে অস্তমিত হয় সূর্যসন্তান জগতজ্যোতি’র  জীবন প্রদীপ। 


 

এ জাতীয় আরো খবর