রবিবার, জুন ১৩, ২০২১

‘নয়া জামাই’ গান নিয়ে কাটল দ্বিধাদ্বন্দ্ব

  • সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ :
image

সুনামগঞ্জ, ৩১ মে  (ঢাকা পোস্ট) : শিল্প-সংস্কৃতির সূতিকাগার সুনামগঞ্জ। এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত, মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজা, জ্ঞানের সাগর বাউল দুরবীন শাহ, বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমসহ শত শত গুণী শিল্পী। কিন্তু এসব গুণী শিল্পীর সৃষ্টি সংগ্রহের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আইলারে নয়া জামাই আসমানের তারা, বিছানা বিছাইয়া দেও শাইল ধানের নেরা। জামাই বও, জামাই বও।’ গানটি ভাইরাল হওয়ার পর গানের রচয়িতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা যায়। পরে জানা যায়, একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী রামকানাই ও সুষমা দাশের মা দিব্যময়ী দাশ ‘নয়া জামাই’ এ গানের রচয়িতা। যদিও গানটি নিয়ে প্রথম দিকে জনমনে দ্বিমত তৈরি হয়েছিল।
গানের সহজ সুন্দর কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায়, এটা সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক গান। এ গান সুনামগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ধারণ করছে। গানের এই লাইনগুলো এখন দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষের মুখে মুখে। এই নয়া জামাই, মানে নতুন বর, বরের বসার জন্য শাইল ধানের নেরায় (নেরা মানে খড়) বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়কেই গানে তুলে ধরা হয়েছে।
জানা যায়, গানের রচয়িতা দিব্যময়ী দাশের বাড়ি শাল্লা থানার হবিবপুর ইউনিয়নের পুটকা গ্রামে। তার স্বামী রসিক লাল দাশও গান লিখতেন এবং গাইতেন। তারা পরে দিরাই উপজেলার রচরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাদের দুই সন্তান পণ্ডিত রামকানাই দাশ ও শিল্পী সুষমা দাশ বাংলাদেশের সংগীতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, সুনামগঞ্জে হাওরে আগে শাইল ধানের আবাদ হতো। কয়েক জাতের শাইল ধানের মধ্যে ছিল ইন্দ্রশাইল, কাকশাইল, ময়না শাইল, কামিনীশাইল, মোটাশাইল, কার্তিক শাইল প্রভৃতি। উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধান তখনো আসেনি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে শাইল ধান কাটার পর খড় যত্ন করে রাখা হতো। এ খড় দিয়ে ঘর তৈরি করা, মেহমানদের বিছানা পেতে দেওয়া, গরুর খাবার, ধান সেদ্ধ দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হতো।

গোলায় ধান তোলার পর শুরু হতো খড় দিয়ে ঘর বানানোর কাজ। অনেকে পুরোনো ঘরের চালে নতুন করে খড়ের ছানি দেওয়া হতো। যেদিন ঘর ছানি হতো বাড়িতে ভালো খাবারের আয়োজন করা হতো। যার সত্যতা পাওয়া যায় বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রবাদ বাক্যে। ‘চাইল ছানির কামলা চাচা দিলায় না, মায় দিছইন মোরগ জব আইয়া চাচা খাইলা না।’
কৃষকরা বলছেন, শাইল ধানসহ দেশীয় ধানের ফলন কম ও সে অনুযায়ী দাম না পাওয়ার জন্যই উচ্চফলনশীল ধান চাষ করেন তারা। ফলন কম হলেও দেশীয় ধানের চাল হাইব্রিড ধানের চাল থেকে সুস্বাদু। এ জন্য ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে সে তুলনায় দাম নেই এ ধানের।
শাল্লার বাহাড়া ইউনিয়নের আঙ্গারোয়া নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক মাখন লাল দাস ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে খড় দিয়ে ঘর বানানো হতো। আমাদের বাপ-দাদাদের বড় বড় খড়ের ঘর ছিল। ছোটবেলায় দেখছি, যেদিন ঘর ছানি হতো, সেদিন বাড়িতে থাকত উৎসবের আমেজ। যারা ঘরের ছানি দিত, তাদের জন্য মোরগ ও ডিমের সালুন রান্না করা হতো।
কৃষক অরুণ বৈদ্য অপু বলেন, আমাদের বড় বাংলা ঘর ছিল। বৈশাখে আবাদকৃত শাইল ধান ঘরে তুলার পরে সবাই বেকার থাকত। চারদিকে পানি থাকার কারণে কোথাও যাওয়ারও সুযোগ ছিল না। এসব গ্রামের তরুণরা বাংলা ঘরে এসে আড্ডা দিত। বাংলা ঘরের মেঝেতে খড়ের বিছানা পেতে দেওয়া হতো। বাড়িতে মেহমান এলেও বাংলা ঘরে জায়গা করে দেওয়া হতো। ২০ থেকে ৩০ জন মেহমান একসঙ্গে থাকতে পারত। কোনো অসুবিধা হতো না।
তাহিরপুরের সনির হাওরের বড় কৃষক গোলাম সরোয়ার লিটন। তিনি এবার ৪০ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে ধান চাষ করেছেন। দেশীয় ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় এবার উচ্চফলনশীল ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, একসময় হাওরে ৯৫ ভাগ জমিতে দেশীয় জাতের ধান চাষ হতো। এই ধানের চাষাবাদের ক্রান্তিকাল ধরা যায় গত ২০ বছরের সময়কে। এখন শাইল ধানের কোনো চাষ হয় না হাওরে। এখন প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় খড়ের ব্যবহারও কমে গেছে। এখন শুধু গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়।

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, সুনামগঞ্জে আগে সবাই শাইল ধান আবাদ করত। শাইল ধানের নেরা মানে খড়। এ খড়ের বহুমাত্রিক ব্যবহার ছিল সুনামগঞ্জে। বিশেষ করে হাওরের উজান এলাকায় মেহমানদের বিছানা করা হতো শাইল ধানের নেরা দিয়ে। অনেকে এর ওপর কাপড় বা কাঁথা পেতে দিত। নতুন জামাইয়ের বসার আসনে দেওয়া হতো খড়। যুগের পরিবর্তনে এখন সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া। তবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে ভুললে চলবে না।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ফরিদুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার হাওরে শাইল জাতের কোনো বোরো ধান সুনামগঞ্জে আবাদ হয়নি। আগে হয়েছে প্রচুর। কারণ শাইল ধান আবাদ করলে জমিতে ধান কম হয়। তাই কৃষক ধীরে ধীরে উচ্চফলনশীল ধানের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।


 

এ জাতীয় আরো খবর