বুধবার, জুন ২৯, ২০২২

বিয়ের পিঁড়িতে দু’হাত হারানো সেই ফাল্গুনী

  • সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :
image

বরিশাল, ৭ ডিসেম্বর : প্রতিবন্ধকতা আসলে মানুষের মানসিকতায় থাকে। নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতা ভালো হলেই কোনো কিছুরই প্রতিবন্ধকতা মনেই হয় না। নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত দেখা গেল বরিশালে। সেখানেই ঐতিহ্যবাহী শংকরমাঠ চত্বরে হিন্দু রীতি মেনে বিবাহ হলো দুজনের মধ্যে। কিন্তু পাত্রীর দুটি হাত নেই। ছোটবেলায় তিনি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দুটি হাত হারিয়ে ছিলেন। এই সুন্দর বিবাহ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছাড়াও অন্যান্য বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন।

২০০২ সাল। ফাল্গুনী সাহার বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। একদিন বাড়ির ছাদে বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুতায়িত হলে তার শরীর থেকে দুই হাতেই কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন করতে হয়। সেই থেকে অন্যভাবে পথচলা শুরু ফাল্গুনীর। তার অদম্য মনোভাব হার মানাতে পারেনি। ২০১১ সালে মাধ্যমিক, ২০১৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ২০১৮ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি। আর গত বুধবার রাতে সাতপাকে বাঁধা পড়েছেন সেই ফাল্গুনী। বসেছেন বিয়ের পিঁড়িতে।  উভয় পরিবারের সম্মতিতেই তাদের বিয়ে হয়েছে বলে তারা জানান। এ বিয়ে দেখতে স্থানীয় উৎসুক মানুষও জড়ো হয়েছিলেন মন্দির প্রাঙ্গণে। এ সময়ে বর সুব্রত মিত্রর মহানুভবতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশংসা করেন তারা।
ফাল্গুনী সাহা বলেন, ২০০২ সালে গলাচিপায় আমাদের পাশের বাড়ির ছাদে বসে বৈদ্যুতিক তারে দুর্ঘটনার কারণে দুই হাতই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি নিজেকে কখনো দুর্বল মনে করিনি। দুই হাতের যতটুকু অংশ ছিলো, ততটুকু অংশ দিয়েই আমি আমার পড়াশুনা শেষ করেছি এবং এখন চাকরিও করছি। আমি ২০১১ সালে মাধ্যমিক পাস করেছি গলাচিপা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। ২০১৩ সালে উত্তরা ট্রাস্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেই। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিওলোজি ও এনভায়রনমেন্ট সাবজেক্টে ২০১৮ সালে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করি। তারপর চাকরি জীবনে প্রবেশ করি।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিকতা ঠিক থাকলে প্রতিবন্ধকতা কোনো বিষয় নয়। আমাদের বিয়েটা দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করি। এই পর্যন্ত পৌঁছাতে সকলেরই আন্তরিকতা পেয়েছি। স্কুল জীবন থেকে কর্মজীবনে যারা আমার সাথে ছিলেন তারা কেউ বুঝতে দেননি আমার দুটো হাত নেই। যার মেন্টালিটি ভালো তিনি এগিয়ে আসবেন, যার পক্ষে এমন বিয়ে সম্ভব না তার দূরে থাকাই ভালো। কারো ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। সকলে আমাদের জন্য আশীর্বাদ ও দোয়া করবেন যাতে সামনের দিনগুলোতে আমরা ভালো থাকতে পারি, ভালো কিছু করতে পারি। বর্তমান সমাজে দমে না যাওয়া প্রেয়সি সাহা অনেক মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
বর সুব্রত মিত্র বলেন, ফাল্গুনীকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ও যখন ভার্সিটিতে পড়তো, তখন ওর সাথে আমার ফেসবুকে কথা হতো। একটা সময় বুঝতে পারি ও পড়াশুনায় অনেক ভালো করছে। তবে ওর ফ্যামিলি লাইফ বা সামনের দিকে আগানোর কোনো চিন্তা-চেতনা ছিলো না। ওর হাত নেই এটা আমার কাছে কোনো সমস্যা মনে হয়নি। একটা লোকের হাত নেই, তাই সে বিয়ে করতে পারবে না, তার ফ্যামিলি হবে না, এমনটা হতে পারে না এবং এমন চিন্তা আমারও নেই। আমি ওকে স্বপ্ন দেখাই, আমি ওকে ভালোবাসা শেখাই এবং আমি ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত জানাই। সবশেষ আমরা বিয়েও করেছি। আমরা সামনের দিনে যেন ভালো থাকতে পারি এর জন্য আমাদের জন্য সকলে আশীর্বাদ করবেন।


এ জাতীয় আরো খবর