শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২

আজ পৌষ সংক্রান্তি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক :
image

সিলেট, ১৪ জানুয়ারী  : প্রবাদ রয়েছে বাঙালির ১২মাসে ১৩ পার্বণ। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তিও বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। আজ শুক্রবার মকর সংক্রান্তি। বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিন এই উৎসব পালন করা হয়। 
পৌষ-সংক্রান্তি হলো সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পিঠা-পায়েসের উৎসব। প্রতি বছর বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এ উৎসব পালন করা হয়। এটি তিল্-সংক্রান্তি বা উত্তরায়ণ-সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। এর আমেজ মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকে। এ উপলক্ষে বাড়ি বাড়ি নানা রকম পিঠা-পুলি তৈরির ধুম লেগে যায় একদিন আগে  থেকেই।
সংক্রান্তির আগের রাতে ছন বা নাড়া দিয়ে ভেড়া ঘর তৈরি করে ছোট ছোট  ছেলেমেয়ে ও যুবকেরা দল বেঁধে। এই ঘরে তারা বনভোজন করে। একে ‘টুপাটুপি’ বলে। খাওয়া-দাওয়া সেরে তারা সারা রাত গান-বাজনাসহ মজা করে কাটায়। ভোরে ভেড়া ঘরের কাছের পুকুরে বা নদীতে ডুব দিয়ে একসঙ্গে স্নান করে ভেড়া ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আগুন পোহায় এবং আনন্দ উপভোগ করে। তারপর নতুন জামা-কাপড় পরে পূজা-অর্চনা সেরে বাড়ি বাড়ি বেড়ায়।
দুপুরের আগেই সবাই সংকীর্তন করার জন্য কোনো মন্দিরের সামনে সমবেত হন। বিশেষ করে গ্রামের বা মহল্লার বা পাড়ার সর্ব পূর্ব প্রান্তের বাড়ি থেকেই এই কীর্তন শুরু করে সর্ব পশ্চিমের বাড়িতে বা কোনো গাছের তলায় এর পরিসমাপ্তি ঘটে। ঐ দিন কীর্তনের সময় প্রত্যেকের বাড়িতেই লুট প্রসাদ বিতরণ করা হয়। লুটের জিনিসের মধ্যে থাকে কদমা, বাতাসা, নকুল, নারিকেল, কলা, খিরা, আপেল, কমলা ইত্যাদি নানা মিঠাই ও ফল-ফলারি। বাড়ির মা-বোনেরা কীর্তন আসার আগেই আঙিনা জুড়ে চালের গুঁড়ি ও নানা রকম রং দিয়ে নকশা আঁকেন।
পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে মেয়েরা স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে এবং অতিথিদের আগমন ঘটে। কোনো কোনো এলাকায় পৌষ-সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বসে নানা ধরনের মেলা। বিশেষ করে মাছমেলার আয়োজন হয়। এ মেলার মূল আকর্ষণ বড় বড় মাছ । সবাই প্রতিযোগিতা করে মাছ কেনে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার পৈল ও মৌলভীবাজার জেলার শেরপুরের মাছমেলা ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।
অনন্ত কাল ধরে সময় প্রবাহমান। সময়ের এই প্রবাহ যতই বেড়ে চলছে সৌরজগতের বয়স তথা পৃথিবীর বয়সও ততই বেড়ে চলেছে। যার ফলে আজ যেটা নূতন কাল সেটা নুতনত্ব হারিয়ে পুরাতন হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু যেন অতীতের দিকে ধাবিত হয়ে চলছে। কিন্তু প্রকৃতির প্রবাহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষ বর্ষপঞ্জি বেঁধে দেওয়ায় সময় বার বার ফিরে আসে। তাই গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হলেই বর্ষা, বর্ষার পর শরৎ এভাবে হেমন্ত, শীত ও বসন্ত কাল আসতে থাকে। সেরকম বাংলা বারোটি মাসও আবর্তিত হতে থাকে। এই আবর্তনে প্রতিমাসের শেষ দিন অর্থাৎ যে দিন মাস পূর্ণ হবে সে দিনকে সংক্রান্তি বলা হয়। এভাবে বারোটি মাসে বারোটি সংক্রান্তির মধ্যে বিশেষ ভাবে পৌষমাসের সংক্রান্তি উল্লেখ্যযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে বলে এই সংক্রান্তিকে উত্তরায়ণ সংক্রান্তিও বলা হয়। শাস্ত্রমতে মানুষের এক বছর দেবতাদের একটি দিন-রাতের সমান অর্থাৎ মানুষের উত্তরায়ণের ছয়মাস দেবতাদের একটি দিন ও দক্ষিণায়নের ছয়মাস দেবতাদের একটি রাত। রাতে মানুষ যেমন সকল দরজা-জানালা, প্রধান ফটক ইত্যাদি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন, তেমনি দেবতাগণও রাতে অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে সবকিছু বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় বাহির থেকে প্রবেশ করার সুযোগ নেই, অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে দেবলোক পুরোপুরি বন্ধ থাকে। আবার দেবগণের রাত পৌষ সংক্রান্তির দিন শেষ হয় বলে পরবর্তী উদয়ের ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে (গোস্বামী মতে) দেবগণের দিবা শুরু হয়। উক্ত সময়ে স্বর্গবাসী ও দেবলোকের সকলেই নিদ্রা ভঙ্গ হয় এবং নিত্য ভগবৎ সেবা মূলক ক্রিয়াদি শুরু হতে থাকে। এই জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ ব্রহ্মমুহূর্তে স্নান, নামযজ্ঞ, গীতাপাঠ, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটিকে আনন্দময় করে তোলেন। আর তাই পৌষ সংক্রান্তি দিনটি বাঙালীর বার মাসে তের পার্বণ কথাটি মনে করিয়ে দেয়।

 


এ জাতীয় আরো খবর