চট্টগ্রাম, ৫ সেপ্টেম্বর : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার সংকট তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারকে সতর্ক করতেই ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের আন্দোলন আরও বড় পরিসরে হতে পারে উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার দিবাগত রাতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের আজকের এই লং মার্চ সরকারকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাকি লং মার্চগুলো এমন হবে না।” তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার মানুষের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা রয়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, “আপনারা উল্টাপাল্টা করবেন, আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে—এটা হবে না।” রাজপথে আসতে সরকারই তাদের বাধ্য করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণভোটের রায় প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের দেওয়া রায় অস্বীকার করে সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পরও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, “৭০ ভাগ জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে, এবং আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।” এ দাবিতে আন্দোলন চলবে এবং বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসতে পারে বলেও নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট চলছে। একই সঙ্গে সমাজে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও নানা ধরনের অনিয়ম বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে দেশের মানুষ ভোট দিয়েছিল। তারা চেয়েছিল দেশে আর ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না, মানুষ ন্যায়বিচার পাবে, সন্তানরা ভালো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং চাঁদাবাজি-দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
ক্ষমতায় ছয় মাস পর সরকারকে ‘শিশু সরকার’ বলা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয়নি। নির্বাচিত সরকারকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বের প্রতি জবাবদিহি করতে হবে।
আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের এই আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।” কোনো ধরনের লোভ বা প্রলোভনে আন্দোলন থেকে সরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সমাবেশ থেকে তিনি শাপলা হত্যাকাণ্ড, গুম, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের হত্যাকাণ্ড, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং আয়নাঘরসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচার দাবি করেন। এসব ঘটনার বিচার আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।
চট্টগ্রামকে আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বীর চট্টলা থেকেই আন্দোলন আজকে শুরু হলো।” তাঁর দাবি, এ লড়াই কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য নয়; জনগণের দাবি ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য।
তিনি বলেন, “এ লড়াই আমাদের চলবে এবং বাংলাদেশও ইনশাআল্লাহ বদলাবে।”
এর আগে সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংবর্ধনা ও অভিবাদন কর্মসূচির পর রাত ৮টার দিকে লংমার্চটি চট্টগ্রামের এসে পৌঁছায়। এই কর্মসূচিতে বেশ কয়েকটি পথসভা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার মাধ্যমে লং মার্চ কর্মসূচি শেষ হয়।
উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর ডা. আমির শফিকুর রহমান।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।