রেনেসাঁ সেন্টার নিয়ে ডেট্রয়েটে গণশুনানি, টাওয়ার ভাঙার বিরোধিতা

আপলোড সময় : ৩০-০৯-২০২৬ ০১:৪৪:১৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৯-২০২৬ ০১:৪৪:১৩ পূর্বাহ্ন
রেনেসাঁ সেন্টার ও পূর্বদিকের নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রস্তাবিত পরিবর্তনের একটি চিত্ররূপ/ Rendering Courtesy Bedrock. 

ডেট্রয়েট, ৩০ সেপ্টেম্বর : ডেট্রয়েটের রেনেসাঁ সেন্টারের পাঁচটি টাওয়ারের মধ্যে দুটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন নগরীর বাসিন্দারা। মঙ্গলবার এক গণশুনানিতে তারা নগর কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান, প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি যেন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নদীতীরবর্তী এলাকার (রিভারফ্রন্ট) পুনর্নির্মাণে ৫০ কোটি ডলারের বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় করা হবে। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এর অংশ হিসেবে রেনেসাঁ সেন্টারের দুটি টাওয়ার ভেঙে ফেললে শহরের অন্যতম প্রতীকী স্থাপনার ক্ষতি হবে এবং ডেট্রয়েটের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
ডেট্রয়েটের বাসিন্দা ডোয়েন হফম্যান বলেন, “টাওয়ারগুলো রক্ষা করা উচিত। এগুলো ভেঙে ফেলা অপচয়।” ‘সেভ দ্য রেনসেন কোয়ালিশন’-এর সদস্য হফম্যান প্রকল্পের প্রতিবাদে ছয় ফুট লম্বা একটি পোস্টার হাতে শুনানিতে অংশ নেন।
প্রস্তাবিত ‘ব্রাউনফিল্ড’ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোলম্যান এ. ইয়াং মিউনিসিপ্যাল সেন্টারে ডেট্রয়েট ব্রাউনফিল্ড রিডেভেলপমেন্ট অথরিটি এ গণশুনানির আয়োজন করে।
শুনানিতে বক্তব্য দেওয়া ১৩ জনের মধ্যে দুজন ডেভেলপারদের সমর্থন করেন। অন্যরা পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করেন। সভায় প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন।
‘রেনেসাঁ সেন্টার অ্যান্ড ইস্ট রিভারফ্রন্ট প্রজেক্ট’-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডেট্রয়েট নদীর সবচেয়ে কাছের ৩০০ ও ৪০০ নম্বর টাওয়ার দুটি ভেঙে সেখানে পাঁচ একর আয়তনের রিভারফ্রন্ট পার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ৭২৭ ফুট উঁচু ম্যারিয়ট হোটেল টাওয়ারের কক্ষসংখ্যা প্রায় ১,৩০০ থেকে কমে ৮৫৮-তে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ১০০ নম্বর টাওয়ারকে আবাসিক ভবন এবং ২০০ নম্বর টাওয়ারকে অফিস স্পেসে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী ৩০ বছরে ডেট্রয়েট নগরী প্রায় ৩০ কোটি ১৫ লাখ ডলারের নিট আর্থিক সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে ২,৭৫৪টি পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান এবং ৮,২৪৩টি নির্মাণকাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ডেভেলপাররা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রকল্পটির অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর জন্য আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে ব্রাউনফিল্ড পরিকল্পনাটি অনুমোদন প্রয়োজন। এপ্রিলে ডেট্রয়েটে অনুষ্ঠিতব্য NCAA Men’s Final Four প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর টাওয়ার দুটি ভাঙার কাজ শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে ডেট্রয়েটের অনেক বাসিন্দার আপত্তি রয়েছে। তারা প্রকল্পের ‘ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ’ (Cost-Benefit Analysis) প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।
‘প্রাইড অব ডেট্রয়েট পিপলস প্ল্যাটফর্ম’-এর থিও প্রাইড আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ট্রান্সফরমেশনাল ব্রাউনফিল্ড প্ল্যান’ ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে। তবে তিনি বলেন, ডেট্রয়েটের বাসিন্দাদের জন্য প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে হবে—শুধু পর্যটক, শহরতলির বাসিন্দা বা রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়।
‘রেনেসাঁ সেন্টার’ ও ‘রিভারইস্ট ডিস্ট্রিক্ট প্রজেক্ট’-এর জন্য প্রস্তাবিত এ ট্রান্সফরমেশনাল ব্রাউনফিল্ড প্ল্যানের সঙ্গে জড়িত রয়েছে জেনারেল মোটরস (GM) ও বেডরক (Bedrock)। প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা সরকারি প্রণোদনা হিসেবে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে, যা তাদের আগের ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের দাবির চেয়ে বেশি।
নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটির মোট ব্যয়ও বেড়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার ধরা হলেও বর্তমানে তা ২.২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে মিশিগানের ‘ট্রান্সফরমেশনাল ব্রাউনফিল্ড প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার, ৩০ বছর মেয়াদি ‘রেনেসাঁ জোন’ থেকে ১৩৩.৮১ মিলিয়ন ডলার এবং ১২ বছর মেয়াদি ‘কমার্শিয়াল রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাক্ট’-এর আওতায় ৩৯.১২ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া ডেট্রয়েটের ‘ডাউনটাউন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ ভবন ভাঙা, রাস্তার দৃশ্যপট উন্নয়ন এবং পথচারীদের চলাচলের সুবিধা বাড়াতে ডেভেলপারদের সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেভেলপাররা প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের মতে, পরিকল্পনাটি নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য জনসাধারণকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন।
ডেট্রয়েটের সমাজকর্মী ডেমিকো উইলিয়ামস বলেন, “প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে। আপনারা জোর করে এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, ‘রেনসেন’ (RenCen) টাওয়ারগুলো জরাজীর্ণ বা পরিত্যক্ত নয়। ফলে সেগুলো ভেঙে ফেলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে গণশুনানিতে উপস্থিত বেডরকের এক কর্মকর্তা বাসিন্দাদের এ অভিযোগের বিরোধিতা করেন যে, প্রকল্পের বিষয়ে তাদের মতামত শোনা হচ্ছে না।
শহর উন্নয়ন কৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেক চিডেস্টার গণশুনানিতে উপস্থিত দর্শকদের জানান যে, ডেভেলপাররা এ পর্যন্ত ১৬টি উন্মুক্ত সভা ও ৯টি কমিউনিটি মিটিং করেছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আয়োজিত এসব সভায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
চিডেস্টার বলেন, “আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি—এর চেয়ে বেশি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কোনো উন্নয়ন প্রকল্প খুঁজে দেখান।”
প্রকল্পের সমর্থক ডেট্রয়েটের বাসিন্দা মার্টেল বিভিংস বলেন, নতুনভাবে গড়ে তোলা স্থাপনাটি শহরে আরও বেশি পর্যটক ও বাসিন্দাকে আকৃষ্ট করতে পারে। জেফারসন-চালমার্স এলাকার বাসিন্দা বিভিংস বলেন, “আমাদের এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বদরবারে ডেট্রয়েটের পরিচিতি বাড়ানো এবং নতুন বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ।”
তবে গণশুনানিতে বক্তব্য দেওয়া কয়েকজন বাসিন্দা বেসরকারি প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, এই অর্থ শহরের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা উচিত।
ডেট্রয়েট অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরসের সাবেক সভাপতি হার্ব স্ট্র্যাদার জানান, অতীতে সংগঠনটি মানুষের সম্পত্তি সরকারি হস্তগত করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে সফলভাবে আন্দোলন করেছে। তিনি বলেন, রেনসেন (RenCen) প্রকল্প ঠেকাতেও একই ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে স্ট্র্যাদার প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি এই ভালো লড়াইয়ে শামিল হতে চান?” তার প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের ডেট্রয়েটবাসী এবং ‘মান্থলি স্ট্যান্ডার্ড’ সংবাদপত্রের প্রকাশক রডনি পিয়ারসনও প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “কাঠামোগতভাবে মজবুত ভবন ভেঙে ফেলার কোনো অর্থ হয় না। এর পরিবর্তে বিদ্যমান ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা যেতে পারে। এতে সবারই লাভ হবে। কেউই চায় না আমাদের শহরের প্রতীকী স্থাপনা রেনেসাঁ সেন্টার ভেঙে ফেলা হোক।” পিয়ারসন আরও বলেন, “ডেট্রয়েট এখন বেশ আকর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে। তাই এসব ভবন পুনর্নির্মাণ করে আবারও কর্মচঞ্চল করে তোলা কঠিন হবে না।”
প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি ডিইজিসি (DEGC)-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত মতামত ১৩ অক্টোবর দুপুর ১২টার মধ্যে ccapler@degc.org ঠিকানায় ইমেইলে পাঠানো যাবে। সরাসরি মতামত জানানোর পরবর্তী সভা ১৪ অক্টোবর দুপুর ১২টায় ডেট্রয়েট ইকোনমিক গ্রোথ কর্পোরেশনের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে।
গণশুনানিতে পাওয়া মতামতগুলো ডেট্রয়েট সিটি কাউন্সিল, কমিউনিটি অ্যাডভাইজরি কমিটি এবং ডেট্রয়েট ব্রাউনফিল্ড রিডেভেলপমেন্ট অথরিটির পরিচালনা পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর সিটি কাউন্সিল চূড়ান্ত ভোট দেবে। পরবর্তী ধাপে এ বিষয়ে ভোট দেবে মিশিগান স্ট্র্যাটেজিক ফান্ডের বোর্ড।
নির্মাণ ও আবাসন খাতে কর্মরত ডেট্রয়েটের বাসিন্দা ডার্নেল ওবামওনি বলেন, “আমি আমার পুরো জীবন ডেট্রয়েটেই কাটিয়েছি—এমন এক সময়েও, যখন শহরের কেন্দ্রস্থলের অনেক ভবনই পরিত্যক্ত ছিল।” তিনি জানান যে, "ডেট্রয়েটে বর্তমানে যেসব পরিবর্তন ঘটছে," তিনি তার পক্ষে।
ডেট্রয়েটে বর্তমানে যে উন্নয়ন ও পরিবর্তন চলছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, “আগে কোনো অগ্রগতি বা নির্মাণকাজ হচ্ছিল না। এখন যখন সর্বত্র নির্মাণকাজ চলছে, তখন অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “নদীতীরবর্তী এলাকায় আমাদের প্রচুর অব্যবহৃত জমি রয়েছে, যা কাজে লাগানো যেতে পারে। পাশাপাশি ডেট্রয়েটের বাসিন্দাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়।"
Source & Photo: http://detroitnews.com
 

সম্পাদকীয় :

চিনু মৃধা : সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

সম্পাদক ও প্রকাশক : চিন্ময় আচার্য্য, নির্বাহী সম্পাদক : কামাল মোস্তফা, সহযোগী সম্পাদক : আশিক রহমান,

বার্তা সম্পাদক : তোফায়েল রেজা সোহেল, ফিচার এডিটর : সৈয়দ আসাদুজ্জামান সোহান, স্টাফ রিপোর্টার : মৃদুল কান্তি সরকার।

যোগাযোগ :

Phone : +1 (313) 312-7006

Email : suprobhatmichigan@gmail.com

Website : www.suprobhatmichigan.com