অরোরা, ইলিনয়, ১৬ অক্টোবর: ইলিনয়ের অরোরায় অবস্থিত বালাজি মন্দিরে গণ-গুলিবর্ষণের পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তির বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে প্যালাটাইন পুলিশ। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের প্রথম দিন, গত রোববার মন্দিরটি হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এ ঘটনায় শিকাগো এলাকার দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, প্যালাটাইনের বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সী আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিস তাঁর এক সহকর্মীকে গত ১১ অক্টোবর বালাজি মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। পরে ওই সহকর্মী বিষয়টি মাউন্ট প্রসপেক্ট পুলিশকে অবহিত করেন।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে দেখা গেছে, পাপোরাকিস প্যালাটাইনে ফিরে যাওয়ার আগে নির্ধারিত দিনে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত মন্দিরটির পার্কিং লটে প্রবেশ করেছিলেন।
প্যালাটাইন পুলিশপ্রধান বিল নর্ড বলেন, “সে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে পার্কিং লটে প্রবেশ করে এবং ১২টা ৩৮ মিনিটে বেরিয়ে যায়। এরপর দুপুর ২টার কিছু আগে তার বাড়ির কাছাকাছি র্যান্ড রোড দিয়ে তাকে প্যালাটাইনের দিকে ফিরে যেতে দেখা যায়।”
পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীরা প্যালাটাইনে পাপোরাকিসের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশ জানায়, তাঁর কাছ থেকে সিরিয়াল নম্বরবিহীন একটি এআর-স্টাইলের রাইফেল, কয়েক শ রাউন্ড গুলি, একটি ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট, একটি গ্যাসের ক্যান এবং নাৎসি প্রতীকযুক্ত বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, তাঁরা আট পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো পেয়েছেন। এতে গত দুই বছর ধরে পরিকল্পিত হামলার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। কর্তৃপক্ষের মতে, ওই নথিতে দক্ষিণ এশীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি পাপোরাকিসের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত পর্যালোচনা করে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন কোনো হুমকি বা ঝুঁকির আশঙ্কা নেই।
নর্ড বলেন, “এই পরিকল্পনায় সে একাই জড়িত ছিল। ইশতেহারে সে উল্লেখ করেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই হামলার পরিকল্পনা করছিল। তবে ১১ অক্টোবর তারিখটি কেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা আমরা এখনও জানার চেষ্টা করছি।”
এ ঘটনার পর শহরতলির বিভিন্ন উপাসনালয়ে পুলিশি নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বালাজি মন্দিরে আসা ভক্তরা জানিয়েছেন, আধ্যাত্মিক উদযাপন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এই সময়কে তাঁরা কোনোভাবেই এ ঘটনার কারণে ম্লান হতে দেবেন না।
মন্দিরের নিয়মিত ভক্ত এবং হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ‘হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ’-এর শিকাগো আঞ্চলিক পরিচালক বালাজি গণেশ বলেন, “এ ঘটনায় একটি সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়েছে। এ ধরনের ঘৃণ্য আচরণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সর্বোত্তম উপায় হলো সমাজের আরও ভালোভাবে সেবা করা।”
একই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন অনুরাথি মাদাসি। বালাজি মন্দিরে নিয়মিত পূজা দিতে আসা একটি পরিবারের সদস্য মাদাসি বলেন, “আমাদের মনোবল অটুট রাখতে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ থাকতে পারে, যারা চায় না আমরা আমাদের সংস্কৃতি উদযাপন করি। তবুও আমাদের তা চালিয়ে যেতে হবে।”
শিকাগোর ‘লুপ’ এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা, নাগরিক অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল, ঘৃণাজনিত অপরাধ কমাতে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর জন্য ফেডারেল তহবিল পুনর্বহাল করা।
‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর ঋষভ চ্যাটি বলেন, “হিন্দু-বিদ্বেষ, ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সহিংসতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে আমাদের মন্দিরগুলোকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে পরিণত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ‘স্টপ এএপিআই হেট’-এর ২০২৫ সালের একটি জরিপের তথ্যও তুলে ধরেন। জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক দক্ষিণ এশীয় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জাতিগত কারণে সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব ঘটনার কারণে তাঁদের মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন’-এর বোর্ড সদস্য লিটসি কুরিসিনকাল বলেন, বিদ্বেষমূলক অপরাধের প্রকৃত ভয়াবহতা অনেক সময় যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না।
তিনি বলেন, “বিদ্বেষমূলক অপরাধকে যখন কেবল ভাঙচুর, সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত এসব অপরাধের প্রকৃত ভয়াবহতা উপেক্ষিত থেকে যায়।”
অরোরার মেয়র জন ল্যাশ জানান, হুমকির অভিযোগ পাওয়ার পর শহরের পুলিশ বিভাগ বিভিন্ন উপাসনালয়ে টহল জোরদার করেছে। পাশাপাশি, পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনও সহযোগিতা করছে।
ল্যাশ বলেন, “আমি কমিউনিটির সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ইলিনয়ের শিখ সম্প্রদায়ও এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। অরোরায় তারা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যাতে কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সম্মিলিতভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।”
সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এশীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত অনেক ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হয় না। এ সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় তাঁরা নীতিগত পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি জানান, গত রোববার তিনি ও তাঁর পরিবার অরোরার ওই মন্দিরে গিয়েছিলেন। দিনটি ছিল ‘শারদ নবরাত্রি’ উৎসবের সূচনা। এ কারণে মন্দিরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, “আমার পরিবার সেখানে ছিল। আমার বাবা-মা সারাদিন মন্দিরে ছিলেন। অথচ আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ একজন পার্কিং লটে ওত পেতে রয়েছে।”
তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যসহ সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রতি এমন বক্তব্য ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর কমিয়ে আনার আহ্বান জানান, যা তাঁর মতে, সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, “ভয়াবহ ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্যকে আরও উসকে দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষ এসব বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের প্রভাবে বাস্তবে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।”
এবিসি৭ শিকাগোকে কৃষ্ণমূর্তি জানিয়েছেন, এ মামলায় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের অভিযোগ যুক্ত করার জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালাবেন।
এদিকে, তদন্তে যুক্ত হয়েছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফেডারেল পর্যায়ে অভিযোগ আনা উচিত কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংস্থাটি বিভিন্ন প্রমাণ পর্যালোচনা করছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা
জোরদার বালাজি
মন্দিরে
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বালাজি মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি অরোরার হিন্দু মন্দিরগুলোকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা হুমকির খবর তারা অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে অরোরা পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের ভক্ত, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ কারণে অবিলম্বে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দিরে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। মন্দিরে আগত সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
মন্দির কর্তৃপক্ষ ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আশ্বস্ত করে জানায়, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: এবিসি৭ শিকাগো (ABC7 Chicago)
মন্দির কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের প্রথম দিন, গত রোববার মন্দিরটি হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এ ঘটনায় শিকাগো এলাকার দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, প্যালাটাইনের বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সী আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিস তাঁর এক সহকর্মীকে গত ১১ অক্টোবর বালাজি মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। পরে ওই সহকর্মী বিষয়টি মাউন্ট প্রসপেক্ট পুলিশকে অবহিত করেন।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে দেখা গেছে, পাপোরাকিস প্যালাটাইনে ফিরে যাওয়ার আগে নির্ধারিত দিনে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত মন্দিরটির পার্কিং লটে প্রবেশ করেছিলেন।
প্যালাটাইন পুলিশপ্রধান বিল নর্ড বলেন, “সে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে পার্কিং লটে প্রবেশ করে এবং ১২টা ৩৮ মিনিটে বেরিয়ে যায়। এরপর দুপুর ২টার কিছু আগে তার বাড়ির কাছাকাছি র্যান্ড রোড দিয়ে তাকে প্যালাটাইনের দিকে ফিরে যেতে দেখা যায়।”
পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীরা প্যালাটাইনে পাপোরাকিসের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশ জানায়, তাঁর কাছ থেকে সিরিয়াল নম্বরবিহীন একটি এআর-স্টাইলের রাইফেল, কয়েক শ রাউন্ড গুলি, একটি ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট, একটি গ্যাসের ক্যান এবং নাৎসি প্রতীকযুক্ত বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, তাঁরা আট পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো পেয়েছেন। এতে গত দুই বছর ধরে পরিকল্পিত হামলার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। কর্তৃপক্ষের মতে, ওই নথিতে দক্ষিণ এশীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি পাপোরাকিসের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত পর্যালোচনা করে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন কোনো হুমকি বা ঝুঁকির আশঙ্কা নেই।
নর্ড বলেন, “এই পরিকল্পনায় সে একাই জড়িত ছিল। ইশতেহারে সে উল্লেখ করেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই হামলার পরিকল্পনা করছিল। তবে ১১ অক্টোবর তারিখটি কেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা আমরা এখনও জানার চেষ্টা করছি।”
এ ঘটনার পর শহরতলির বিভিন্ন উপাসনালয়ে পুলিশি নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বালাজি মন্দিরে আসা ভক্তরা জানিয়েছেন, আধ্যাত্মিক উদযাপন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এই সময়কে তাঁরা কোনোভাবেই এ ঘটনার কারণে ম্লান হতে দেবেন না।
মন্দিরের নিয়মিত ভক্ত এবং হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ‘হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ’-এর শিকাগো আঞ্চলিক পরিচালক বালাজি গণেশ বলেন, “এ ঘটনায় একটি সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়েছে। এ ধরনের ঘৃণ্য আচরণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সর্বোত্তম উপায় হলো সমাজের আরও ভালোভাবে সেবা করা।”
একই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন অনুরাথি মাদাসি। বালাজি মন্দিরে নিয়মিত পূজা দিতে আসা একটি পরিবারের সদস্য মাদাসি বলেন, “আমাদের মনোবল অটুট রাখতে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ থাকতে পারে, যারা চায় না আমরা আমাদের সংস্কৃতি উদযাপন করি। তবুও আমাদের তা চালিয়ে যেতে হবে।”
শিকাগোর ‘লুপ’ এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা, নাগরিক অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল, ঘৃণাজনিত অপরাধ কমাতে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর জন্য ফেডারেল তহবিল পুনর্বহাল করা।
‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর ঋষভ চ্যাটি বলেন, “হিন্দু-বিদ্বেষ, ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সহিংসতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে আমাদের মন্দিরগুলোকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে পরিণত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ‘স্টপ এএপিআই হেট’-এর ২০২৫ সালের একটি জরিপের তথ্যও তুলে ধরেন। জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক দক্ষিণ এশীয় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জাতিগত কারণে সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব ঘটনার কারণে তাঁদের মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন’-এর বোর্ড সদস্য লিটসি কুরিসিনকাল বলেন, বিদ্বেষমূলক অপরাধের প্রকৃত ভয়াবহতা অনেক সময় যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না।
তিনি বলেন, “বিদ্বেষমূলক অপরাধকে যখন কেবল ভাঙচুর, সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত এসব অপরাধের প্রকৃত ভয়াবহতা উপেক্ষিত থেকে যায়।”
অরোরার মেয়র জন ল্যাশ জানান, হুমকির অভিযোগ পাওয়ার পর শহরের পুলিশ বিভাগ বিভিন্ন উপাসনালয়ে টহল জোরদার করেছে। পাশাপাশি, পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনও সহযোগিতা করছে।
ল্যাশ বলেন, “আমি কমিউনিটির সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ইলিনয়ের শিখ সম্প্রদায়ও এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। অরোরায় তারা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যাতে কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সম্মিলিতভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।”
সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এশীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত অনেক ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হয় না। এ সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় তাঁরা নীতিগত পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি জানান, গত রোববার তিনি ও তাঁর পরিবার অরোরার ওই মন্দিরে গিয়েছিলেন। দিনটি ছিল ‘শারদ নবরাত্রি’ উৎসবের সূচনা। এ কারণে মন্দিরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, “আমার পরিবার সেখানে ছিল। আমার বাবা-মা সারাদিন মন্দিরে ছিলেন। অথচ আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ একজন পার্কিং লটে ওত পেতে রয়েছে।”
তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যসহ সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রতি এমন বক্তব্য ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর কমিয়ে আনার আহ্বান জানান, যা তাঁর মতে, সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, “ভয়াবহ ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্যকে আরও উসকে দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষ এসব বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের প্রভাবে বাস্তবে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।”
এবিসি৭ শিকাগোকে কৃষ্ণমূর্তি জানিয়েছেন, এ মামলায় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের অভিযোগ যুক্ত করার জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালাবেন।
এদিকে, তদন্তে যুক্ত হয়েছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফেডারেল পর্যায়ে অভিযোগ আনা উচিত কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংস্থাটি বিভিন্ন প্রমাণ পর্যালোচনা করছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা
জোরদার বালাজি
মন্দিরে
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বালাজি মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি অরোরার হিন্দু মন্দিরগুলোকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা হুমকির খবর তারা অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে অরোরা পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের ভক্ত, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ কারণে অবিলম্বে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দিরে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। মন্দিরে আগত সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
মন্দির কর্তৃপক্ষ ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আশ্বস্ত করে জানায়, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: এবিসি৭ শিকাগো (ABC7 Chicago)