হৃদরোগে মৃত্যুহারে মিশিগান ও  যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে ডেট্রয়েট

আপলোড সময় : ২০-১০-২০২৬ ০২:৫৩:৫০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২০-১০-২০২৬ ০২:৫৩:৫০ পূর্বাহ্ন
১৬ অক্টোবর, শুক্রবার ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ড. ফিলিপ লেভি (বাঁয়ে) ‘ওয়েইন মোবাইল হেলথ ইউনিট’-এর কর্মীদের সঙ্গে ছবির জন্য পোজ দেন/Katy Kildee, The Detroit News

ডেট্রয়েট, ২০ অক্টোবর : যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর মধ্যে ডেট্রয়েটে হৃদরোগে মৃত্যুহার অন্যতম সর্বোচ্চ। উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন সংস্থা নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। খাদ্যাভ্যাসের উন্নয়ন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো—বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে মিশিগানের কোরওয়েল হেলথ ও ন্যাশভিলের মেহারি মেডিকেল কলেজ ডেট্রয়েটে হৃদরোগের হার কমাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিভিন্ন সংস্থা ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কাজ করছে। এর মধ্যে হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়টিও রয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি ডেট্রয়েটের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট পাঠাচ্ছে। এসব ইউনিটের কর্মীরা স্থানীয় বাসিন্দাদের রক্তচাপ মাপার পাশাপাশি হৃদরোগের অন্যান্য ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশ্লেষণ করা মিশিগান ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডেট্রয়েটে বয়স-সমন্বিত হৃদরোগজনিত মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ২৭৫ দশমিক ৬ জন। তুলনায়, মিশিগানে এই হার ছিল ১৯৪ দশমিক ৫ এবং পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ১৬২ দশমিক ৭ জন।
ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ও হৃদ্‌রোগ গবেষক ড. ফিলিপ লেভি বলেন, “এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক—শুধু মানুষের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, সামগ্রিক আয়ুষ্কালের দিক থেকেও। মানুষ যখন অল্প বয়সে মারা যায়, তখন তা পুরো সম্প্রদায়ের প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। এর ফলে পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জনদের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই হারাতে হয়।”
হৃদরোগের কারণ অনুসন্ধান করে এ সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করছে বেশ কয়েকটি সংস্থা। সম্প্রতি কোরওয়েল হেলথ, মেহারি মেডিকেল কলেজের স্কুল অব গ্লোবাল হেলথ এবং স্থানীয় অংশীদাররা ‘হার্ট’ (HEART) উদ্যোগ চালু করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সংস্থা একযোগে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় হৃদ্‌স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শহরে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে, যার একটি ডেট্রয়েট। মেহারি স্কুল অব গ্লোবাল হেলথের প্রতিষ্ঠাতা ডিন ড্যানিয়েল ডস জানান, কর্মসূচিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য উন্নতি আনা সম্ভব হয়।
ডস বলেন, “আমি আশা করি, ডেট্রয়েটের মতো একটি শহরে আমরা স্বাস্থ্যগত দিক থেকে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারব। মানুষ যেন হৃদরোগকে বংশগত ও অনিবার্য ভেবে এমনটা মনে না করেন যে, ‘আমার দাদি এ রোগে মারা গেছেন, তাই আমারও হবে এবং শেষ পর্যন্ত আমিও মারা যাব।’” তিনি উল্লেখ করেন, হৃদরোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের অনেক ক্ষেত্রই প্রতিরোধযোগ্য।
এদিকে, ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ডেট্রয়েট মেডিকেল সেন্টার শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঠাচ্ছে। তাঁরা রক্তচাপ পরিমাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন, সেসব স্থানে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না বলে জানিয়েছেন ড. ফিলিপ লেভি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির পপুলেশন হেলথ অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ‘হার্ট’ উদ্যোগের কমিউনিটি অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য।
লেভি বলেন, হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো না করালে একজন ব্যক্তি নিজের রক্তচাপের মাত্রা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন না।
লেভি বলেন, “তাই এসব পরিমাপের মাধ্যমে নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে জানা হলো ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রথম ধাপ। পরবর্তী ধাপ হলো—ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর তা মোকাবিলায় কী করা যেতে পারে, তা নির্ধারণ করা।”
ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘ফিনিক্স প্রিভ্যালেন্স প্রোফাইলার’ (PHOENIX Prevalence Profiler)-এর একটি মানচিত্রে দেখা যায়, ডেট্রয়েটের অনেক জনগণনা এলাকায় করোনারি হৃদরোগের হার মিশিগানের মধ্যম মানের সমান বা তার বেশি।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর ২০২৩ সালের জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে মানচিত্রটি তৈরি করা হয়েছে। এতে এমন প্রাপ্তবয়স্কদের শতকরা হার তুলে ধরা হয়েছে, যাঁদের করোনারি হৃদরোগ বা এনজাইনা (বুকে ব্যথা) রয়েছে বলে কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী জানিয়েছেন।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ডেট্রয়েটের কয়েকটি জনগণনা এলাকায় করোনারি হৃদরোগের হার ‘খুবই বেশি’। উল্লেখ্য, করোনারি হৃদরোগ যুক্তরাষ্ট্রে হৃদরোগের সবচেয়ে সাধারণ ধরন।
তবে মেট্রো ডেট্রয়েটের শহরতলির কয়েকটি এলাকাতেও এ রোগের হার বেশি। বিপরীতে, ফার্নডেলের মতো কিছু এলাকায় করোনারি হৃদরোগের হার তুলনামূলকভাবে কম।
‘ন্যাশনাল হার্ট, লাং, অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট’-এর মতে, কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের মধ্যে রয়েছে করোনারি হৃদরোগ, স্ট্রোক ও হার্ট ফেইলিউর। এসব রোগ হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, হৃদরোগ হলো কার্ডিওভাসকুলার রোগের একটি ধরন, যা হৃদ্‌যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে।
ডিএমসি ডেট্রয়েট রিসিভিং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক লেভি জানান, হৃদরোগের প্রধান ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও স্থূলতা। উচ্চ কোলেস্টেরল ছাড়া এসব ঝুঁকির অন্যান্য কারণ ডেট্রয়েটে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
লেভির মতে, ডেট্রয়েটে হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলো প্রায়ই দেরিতে শনাক্ত হয় এবং যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর পেছনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও রোগীদের মধ্যে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে রোগীদের সংযোগের ঘাটতি ভূমিকা রাখে। শহরের অনেক এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরও অভাব রয়েছে। পাশাপাশি, ডেট্রয়েটের কিছু এলাকার বাসিন্দারা পরিবেশদূষণের শিকার হন, যা তাঁদের হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
লেভি আরও জানান, আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে ডেট্রয়েটের অনেক বাসিন্দার পক্ষে চিকিৎসকের কাছে প্রথমবার যাওয়া কিংবা পরবর্তী ফলোআপ অ্যাপয়েন্টমেন্টে যোগ দেওয়ার জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই কারণে তাঁদের অনেকের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার কেনাও কষ্টসাধ্য।
তিনি বলেন, হৃদরোগের ক্ষেত্রে জিনগত উপাদানের ভূমিকা থাকলেও, “এটিই মূল বা প্রধান কারণ নয়।” তাঁর ভাষায়, “মূলত সমাজে মানুষের জীবনযাপন এবং তাঁদের চারপাশের পরিবেশের প্রভাবই হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।”
লেভির মতে, ডেট্রয়েটে অন্যান্য এলাকার তুলনায় মানুষ কম বয়সেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং তুলনামূলক অল্প বয়সে এ রোগে প্রাণও হারান।
Source & Photo: http://detroitnews.com
 

সম্পাদকীয় :

চিনু মৃধা : সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

সম্পাদক ও প্রকাশক : চিন্ময় আচার্য্য, নির্বাহী সম্পাদক : কামাল মোস্তফা, সহযোগী সম্পাদক : আশিক রহমান,

বার্তা সম্পাদক : তোফায়েল রেজা সোহেল, ফিচার এডিটর : সৈয়দ আসাদুজ্জামান সোহান, স্টাফ রিপোর্টার : মৃদুল কান্তি সরকার।

যোগাযোগ :

Phone : +1 (313) 312-7006

Email : suprobhatmichigan@gmail.com

Website : www.suprobhatmichigan.com