ডেট্রয়েট, ৫ নভেম্বর : জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের সমর্থনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট এসব ভোটার পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে তার পক্ষে অবস্থান নেন।
এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করে নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছিল। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে অ্যান আরবারের সাবেক এই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা রিপাবলিকান দলের সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে ৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
তার এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরের সেই অংশের ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যারা মনে করতেন, মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে একজন প্রগতিশীল প্রার্থীর পক্ষে জয়ী হওয়া কঠিন—বিশেষ করে তার নাম আরবি হলে।
বুধবার ভোরে বিজয় ভাষণে এল-সায়েদ বলেন, “যেসব বাবা-মা সন্তানদের বোঝাতে হিমশিম খেয়েছেন, কেন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে মানুষের নাম কিংবা প্রার্থনার ধরন নিয়ে উপহাস করেন, তাদের সন্তানদের জানিয়ে দিন—খারাপ মানুষগুলো হেরে গেছে।”
ওহাইও থেকে আসা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও কটাক্ষ করেন এল-সায়েদ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার সময় দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বক্তব্যে এল-সায়েদ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। আগামী জানুয়ারিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভ্যান্সের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তাকে শপথবাক্য পাঠ করাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে এল-সায়েদ বলেন, “তাহলে বুঝতেই পারছেন, এর অর্থ কী? উলভারিনস ১, বাকআইস ০।” উল্লেখ্য, উলভারিনস মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের পরিচিতি এবং বাকআইস ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের পরিচিতি।
এল-সায়েদ যেখানে
ভোটারদের সমর্থন
পেয়েছেন
বিজয়ের পথে এল-সায়েদ অন্তত চারটি কাউন্টিতে জয়ী হয়েছেন, যেখানে মাত্র দুই বছর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়লাভ করেছিলেন। এসব কাউন্টির মধ্যে রয়েছে ল্যান্সিংয়ের বাইরে ইটন কাউন্টি, হ্রদতীরবর্তী মাস্কেগন কাউন্টি, উত্তর মিশিগানের গ্র্যান্ড ট্র্যাভার্স কাউন্টি এবং গ্রামীণ ইসাবেলা কাউন্টি, যেখানে অবস্থিত সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটি।
পাঁচটি কাউন্টিতে—ওয়েইন, ম্যাকম্ব, ইসাবেলা, ডিকিনসন ও মার্কেটে—২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় এল-সায়েদ দুই অঙ্কের শতাংশ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়েছেন।
অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, মিশিগানের ৮৩টি কাউন্টির প্রতিটিতেই এল-সায়েদের ফলাফল ডেমোক্র্যাট গভর্নর-নির্বাচিত জোসেলিন বেনসনের ৯ শতাংশ পয়েন্টের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে কম ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন নতুন করে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত প্রায় ১৫ হাজার মানুষের সমর্থন পেয়েছেন এল-সায়েদ, যাঁদের বড় একটি অংশ তরুণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডিয়ারবর্নের মতো এলাকায় ভোটার উপস্থিতির নতুন রেকর্ড দেখা গেছে। আরব-আমেরিকান অধ্যুষিত এই শহরের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে সাময়িকভাবে ব্যালট পেপারও ফুরিয়ে যায়।
মিশিগানের বৃহত্তম শহর ও ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি ডেট্রয়েটেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের তুলনায় ভালো ফল করেছেন এল-সায়েদ। অন্যদিকে, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রচার চালিয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। হোয়াইট লেক টাউনশিপের সাবেক সাতবারের কংগ্রেসম্যান রজার্স ডেট্রয়েটে পেয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ ভোট। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্লটকিনের কাছে পরাজিত হওয়ার সময় শহরটিতে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৭ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পরামর্শক এবং স্বতন্ত্র গভর্নর প্রার্থী মাইক ডুগানের সাবেক মুখপাত্র আন্দ্রেয়া বিটলি বলেন, “গত এক বছর ধরে পুরো মিশিগানে জমে ওঠা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন আব্দুল এল-সায়েদ। শুল্ক আরোপের ফলে মিশিগানের বাসিন্দাদের ওপর বছরে অতিরিক্ত ৬ হাজার ডলারের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণেও মানুষ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছিলেন।”
“আব্দুল এল-সায়েদ ভবিষ্যতের জন্য আশার একটি পথ দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মাইক রজার্স এমন এক পথের কথা বলেছেন, যেখানে আশার কোনো আলো নেই।”
এল-সায়েদ ‘দ্য ডেট্রয়েট নিউজ’-কে জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পরাজয় স্বীকার করে তাঁকে ফোন করেননি।
বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় দেওয়া এক বিবৃতিতে রজার্স তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় যাঁরা তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রচারণায় সাক্ষরতা, উৎপাদনশিল্প, সাশ্রয়ী আবাসন এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
বিবৃতিতে রজার্স বলেন, “আমরা এমন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, যা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। পাশাপাশি মিশিগানের বাসিন্দারা যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলোর কার্যকর সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি। আমাদের এই অঙ্গরাজ্যকে রক্ষা করতে হবে, আর এখন সেই প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে। আমি আশাবাদী, মিশিগানের সেরা দিনগুলো এখনো সামনে অপেক্ষা করছে।”
৪ নভেম্বর ‘দ্য নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এল-সায়েদ বলেন, তিনি অত্যন্ত গর্বিত যে তাঁর অঙ্গরাজ্যের মানুষ “ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন” এবং “সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে—এই বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছেন।”
নির্বাচনের রাতে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর রজার্সকে উদ্দেশ করে এল-সায়েদ বলেন, “তাহলে মাইক, এবার আপনার অবসর জীবন উপভোগ করুন। আমি জানি, ফ্লোরিডায় আপনার একটি বাড়ি ও দুটি প্রমোদতরী (ইয়ট) রয়েছে। দেখুন, আপনি বেছে নিয়েছিলেন ঘৃণার পথ, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশার পথ।” তিনি আরও বলেন, “আশা করি, এই অঙ্গরাজ্যে আপনার মতো কাউকে আর কখনো দেখতে হবে না।”
১২০ শহরে
৭০০ কর্মসূচি
নির্বাচনী প্রচারণার ১৯ মাসে এল-সায়েদ মিশিগানের ১২০টি শহরে ৭০০টি জনসভা ও গণসমাবেশে বক্তব্য দেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল আপার পেনিনসুলা, গ্রামীণ জনপদ এবং পশ্চিম মিশিগানের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাও। এসব অঞ্চলে সাধারণত ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের সমর্থকগোষ্ঠী ও নির্বাচনী জোটের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেন।
মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ব্র্যান্ডন ডিলন বলেন, “যখন দেখবেন, তিনি বেরিন কাউন্টিতে ৮০০ জন এবং মিশিগানের হার্ট শহরে প্রায় ৬০০ মানুষকে সমবেত করতে পেরেছেন, তখন বুঝতে হবে—তিনি এমন সব এলাকায় গিয়েছিলেন, যেখানে মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, কোনো ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী তাঁদের কাছে আসবেন এবং তাঁদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।”
ডিলন আরও বলেন, “কিছু এলাকায় তিনি পিছিয়ে ছিলেন। যেমন—ওকল্যান্ড কাউন্টি এবং ম্যাকম্ব কাউন্টির কয়েকটি অংশ। এর কারণ আমাদের সবারই জানা।” তিনি মূলত ইহুদি ভোটারদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করছিলেন। ইসরায়েল বিষয়ে এল-সায়েদের অবস্থানের কারণে এসব ভোটারের একটি অংশ তাঁকে সমর্থন করেননি।
ডিলন আরও বলেন, “নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব সব সময়ই থাকে। মিশিগানের কিছু এলাকায় এখনো ‘আব্দুল এল-সায়েদ’ নামের একজন প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন পাওয়া কঠিন। তবে সৌভাগ্যবশত, রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এসব এলাকার পরিধি অনেক ছোট। অন্যদিকে, রাজ্যের বড় একটি অংশের মানুষ বলেছিলেন, ‘চলুন, আমরা এগিয়ে যাই!’”
মিশিগানে রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের অন্যান্য প্রার্থীরা যেভাবে জয়ী হন, আব্দুল এল-সায়েদের বিজয়ের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই চিত্র দেখা গেছে। অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, মেট্রো ডেট্রয়েট ও বৃহত্তর গ্র্যান্ড র্যাপিডস অঞ্চলের মতো জনবহুল এবং ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত এলাকাগুলোতে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন।
মিশিগানের ৮৩টি কাউন্টির মধ্যে ৬৯টিতে জয় পেয়েছেন রজার্স। তবে প্রতিটি কাউন্টিতেই দুই বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় তাঁর ভোটের ব্যবধান কমেছে। ২০২৪ সালের ওই নির্বাচনে তিনি বর্তমান মার্কিন সিনেটর এলিসা স্লটকিনের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। স্লটকিন হলি শহরের বাসিন্দা।
মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান কার্টিস হারটেল জুনিয়র বলেন, “মাইক রজার্সের নির্বাচনী প্রচারণা আমার দেখা সবচেয়ে বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও জঘন্য প্রচারণাগুলোর একটি। এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেটাই যেকোনো মানুষের জন্য অপমানজনক। এটি আমেরিকার অতীতের এমন এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আমাদের সমাজে বিদ্বেষের মাত্রা ছিল অনেক বেশি।”
Source & Photo: http://detroitnews.com
এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করে নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছিল। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে অ্যান আরবারের সাবেক এই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা রিপাবলিকান দলের সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে ৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
তার এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরের সেই অংশের ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যারা মনে করতেন, মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে একজন প্রগতিশীল প্রার্থীর পক্ষে জয়ী হওয়া কঠিন—বিশেষ করে তার নাম আরবি হলে।
বুধবার ভোরে বিজয় ভাষণে এল-সায়েদ বলেন, “যেসব বাবা-মা সন্তানদের বোঝাতে হিমশিম খেয়েছেন, কেন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে মানুষের নাম কিংবা প্রার্থনার ধরন নিয়ে উপহাস করেন, তাদের সন্তানদের জানিয়ে দিন—খারাপ মানুষগুলো হেরে গেছে।”
ওহাইও থেকে আসা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও কটাক্ষ করেন এল-সায়েদ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার সময় দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বক্তব্যে এল-সায়েদ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। আগামী জানুয়ারিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভ্যান্সের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তাকে শপথবাক্য পাঠ করাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে এল-সায়েদ বলেন, “তাহলে বুঝতেই পারছেন, এর অর্থ কী? উলভারিনস ১, বাকআইস ০।” উল্লেখ্য, উলভারিনস মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের পরিচিতি এবং বাকআইস ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের পরিচিতি।
এল-সায়েদ যেখানে
ভোটারদের সমর্থন
পেয়েছেন
বিজয়ের পথে এল-সায়েদ অন্তত চারটি কাউন্টিতে জয়ী হয়েছেন, যেখানে মাত্র দুই বছর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়লাভ করেছিলেন। এসব কাউন্টির মধ্যে রয়েছে ল্যান্সিংয়ের বাইরে ইটন কাউন্টি, হ্রদতীরবর্তী মাস্কেগন কাউন্টি, উত্তর মিশিগানের গ্র্যান্ড ট্র্যাভার্স কাউন্টি এবং গ্রামীণ ইসাবেলা কাউন্টি, যেখানে অবস্থিত সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটি।
পাঁচটি কাউন্টিতে—ওয়েইন, ম্যাকম্ব, ইসাবেলা, ডিকিনসন ও মার্কেটে—২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় এল-সায়েদ দুই অঙ্কের শতাংশ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়েছেন।
অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, মিশিগানের ৮৩টি কাউন্টির প্রতিটিতেই এল-সায়েদের ফলাফল ডেমোক্র্যাট গভর্নর-নির্বাচিত জোসেলিন বেনসনের ৯ শতাংশ পয়েন্টের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে কম ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন নতুন করে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত প্রায় ১৫ হাজার মানুষের সমর্থন পেয়েছেন এল-সায়েদ, যাঁদের বড় একটি অংশ তরুণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডিয়ারবর্নের মতো এলাকায় ভোটার উপস্থিতির নতুন রেকর্ড দেখা গেছে। আরব-আমেরিকান অধ্যুষিত এই শহরের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে সাময়িকভাবে ব্যালট পেপারও ফুরিয়ে যায়।
মিশিগানের বৃহত্তম শহর ও ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি ডেট্রয়েটেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের তুলনায় ভালো ফল করেছেন এল-সায়েদ। অন্যদিকে, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রচার চালিয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। হোয়াইট লেক টাউনশিপের সাবেক সাতবারের কংগ্রেসম্যান রজার্স ডেট্রয়েটে পেয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ ভোট। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্লটকিনের কাছে পরাজিত হওয়ার সময় শহরটিতে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৭ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পরামর্শক এবং স্বতন্ত্র গভর্নর প্রার্থী মাইক ডুগানের সাবেক মুখপাত্র আন্দ্রেয়া বিটলি বলেন, “গত এক বছর ধরে পুরো মিশিগানে জমে ওঠা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন আব্দুল এল-সায়েদ। শুল্ক আরোপের ফলে মিশিগানের বাসিন্দাদের ওপর বছরে অতিরিক্ত ৬ হাজার ডলারের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণেও মানুষ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছিলেন।”
“আব্দুল এল-সায়েদ ভবিষ্যতের জন্য আশার একটি পথ দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মাইক রজার্স এমন এক পথের কথা বলেছেন, যেখানে আশার কোনো আলো নেই।”
এল-সায়েদ ‘দ্য ডেট্রয়েট নিউজ’-কে জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পরাজয় স্বীকার করে তাঁকে ফোন করেননি।
বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় দেওয়া এক বিবৃতিতে রজার্স তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় যাঁরা তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রচারণায় সাক্ষরতা, উৎপাদনশিল্প, সাশ্রয়ী আবাসন এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
বিবৃতিতে রজার্স বলেন, “আমরা এমন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, যা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। পাশাপাশি মিশিগানের বাসিন্দারা যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলোর কার্যকর সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি। আমাদের এই অঙ্গরাজ্যকে রক্ষা করতে হবে, আর এখন সেই প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে। আমি আশাবাদী, মিশিগানের সেরা দিনগুলো এখনো সামনে অপেক্ষা করছে।”
৪ নভেম্বর ‘দ্য নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এল-সায়েদ বলেন, তিনি অত্যন্ত গর্বিত যে তাঁর অঙ্গরাজ্যের মানুষ “ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন” এবং “সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে—এই বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছেন।”
নির্বাচনের রাতে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর রজার্সকে উদ্দেশ করে এল-সায়েদ বলেন, “তাহলে মাইক, এবার আপনার অবসর জীবন উপভোগ করুন। আমি জানি, ফ্লোরিডায় আপনার একটি বাড়ি ও দুটি প্রমোদতরী (ইয়ট) রয়েছে। দেখুন, আপনি বেছে নিয়েছিলেন ঘৃণার পথ, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশার পথ।” তিনি আরও বলেন, “আশা করি, এই অঙ্গরাজ্যে আপনার মতো কাউকে আর কখনো দেখতে হবে না।”
১২০ শহরে
৭০০ কর্মসূচি
নির্বাচনী প্রচারণার ১৯ মাসে এল-সায়েদ মিশিগানের ১২০টি শহরে ৭০০টি জনসভা ও গণসমাবেশে বক্তব্য দেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল আপার পেনিনসুলা, গ্রামীণ জনপদ এবং পশ্চিম মিশিগানের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাও। এসব অঞ্চলে সাধারণত ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের সমর্থকগোষ্ঠী ও নির্বাচনী জোটের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেন।
মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ব্র্যান্ডন ডিলন বলেন, “যখন দেখবেন, তিনি বেরিন কাউন্টিতে ৮০০ জন এবং মিশিগানের হার্ট শহরে প্রায় ৬০০ মানুষকে সমবেত করতে পেরেছেন, তখন বুঝতে হবে—তিনি এমন সব এলাকায় গিয়েছিলেন, যেখানে মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, কোনো ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী তাঁদের কাছে আসবেন এবং তাঁদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।”
ডিলন আরও বলেন, “কিছু এলাকায় তিনি পিছিয়ে ছিলেন। যেমন—ওকল্যান্ড কাউন্টি এবং ম্যাকম্ব কাউন্টির কয়েকটি অংশ। এর কারণ আমাদের সবারই জানা।” তিনি মূলত ইহুদি ভোটারদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করছিলেন। ইসরায়েল বিষয়ে এল-সায়েদের অবস্থানের কারণে এসব ভোটারের একটি অংশ তাঁকে সমর্থন করেননি।
ডিলন আরও বলেন, “নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব সব সময়ই থাকে। মিশিগানের কিছু এলাকায় এখনো ‘আব্দুল এল-সায়েদ’ নামের একজন প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন পাওয়া কঠিন। তবে সৌভাগ্যবশত, রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এসব এলাকার পরিধি অনেক ছোট। অন্যদিকে, রাজ্যের বড় একটি অংশের মানুষ বলেছিলেন, ‘চলুন, আমরা এগিয়ে যাই!’”
মিশিগানে রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের অন্যান্য প্রার্থীরা যেভাবে জয়ী হন, আব্দুল এল-সায়েদের বিজয়ের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই চিত্র দেখা গেছে। অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, মেট্রো ডেট্রয়েট ও বৃহত্তর গ্র্যান্ড র্যাপিডস অঞ্চলের মতো জনবহুল এবং ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত এলাকাগুলোতে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন।
মিশিগানের ৮৩টি কাউন্টির মধ্যে ৬৯টিতে জয় পেয়েছেন রজার্স। তবে প্রতিটি কাউন্টিতেই দুই বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় তাঁর ভোটের ব্যবধান কমেছে। ২০২৪ সালের ওই নির্বাচনে তিনি বর্তমান মার্কিন সিনেটর এলিসা স্লটকিনের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। স্লটকিন হলি শহরের বাসিন্দা।
মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান কার্টিস হারটেল জুনিয়র বলেন, “মাইক রজার্সের নির্বাচনী প্রচারণা আমার দেখা সবচেয়ে বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও জঘন্য প্রচারণাগুলোর একটি। এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেটাই যেকোনো মানুষের জন্য অপমানজনক। এটি আমেরিকার অতীতের এমন এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আমাদের সমাজে বিদ্বেষের মাত্রা ছিল অনেক বেশি।”
Source & Photo: http://detroitnews.com