ডেট্রয়েট, ১৮ মে : বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রবিবার রাতে ডেট্রয়েট শহরের কেন্দ্রস্থল (ডাউনটাউন) এলাকায় কিশোর-কিশোরীদের সহিংসতা আবারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। এ সময় বড় ধরনের মারামারির ঘটনা ঘটে এবং ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়। তবে তার আঘাত প্রাণঘাতী নয় বলে জানা গেছে।
ডেট্রয়েট পুলিশের প্রধান টড বেটিসন সাংবাদিকদের জানান, গুলিবিদ্ধ কিশোরের বয়স ১৪ বছর। পাশাপাশি একাধিক মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
মারামারির একটি ঘটনার বিবরণ দেন ডেট্রয়েট পুলিশের কমিশনার ডারিয়াস মরিস, যিনি মেয়র মেরি শেফিল্ডের ‘ছয়-দফা পরিকল্পনা’র সমালোচক হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, ওই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো কিশোর-কিশোরীদের জন্য সংগঠিত ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা। রবিবার রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে কমিশনার ডারিয়াস মরিস দাবি করেন, ওই রাতে ডেট্রয়েট ডাউনটাউনে প্রায় ৫০০ কিশোর-কিশোরী একটি বড় ধরনের মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, কিশোর সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে মেয়রের উদ্যোগ একটি “ব্যর্থ সমাধান”।
ডেট্রয়েট পুলিশের রেডিও বার্তার তথ্য অনুযায়ী, রাত ১০টার দিকে একাধিক জরুরি কল আসে। এসব বার্তায় জানানো হয়, উডওয়ার্ড ও গ্র্যাটিওট এলাকার আশপাশে শত শত কিশোর-কিশোরী জড়ো হয়েছে।
তারা কি ‘লিটল সিজারস অ্যারেনা’-তে অনুষ্ঠিত এনবিএ ইস্টার্ন কনফারেন্স সেমিফাইনালের সপ্তম ম্যাচটি দেখার উদ্দেশ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলে এসেছিল—যে ম্যাচে ডেট্রয়েট পিস্টনস ক্লিভল্যান্ড ক্যাভালিয়ার্সের কাছে ১২৫–৯৪ পয়েন্টে হেরে যায়—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা মারধরের শিকার এক ব্যক্তির জন্য অ্যাম্বুলেন্সের অনুরোধ জানান। Broadcastify.com-এ প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তা কন্ট্রোল রুমকে জানান, “এখানে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। প্রচুর কিশোর-কিশোরী জড়ো হয়েছে এবং তারা বারবার একই ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কিছুক্ষণ আগেই আরেকটি মারধরের ঘটনা ঘটে। এখন একজন ব্যক্তি জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছেন। দ্রুত সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করছি।” জবাবে কন্ট্রোল রুমের অপারেটর জানান, অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর অনুরোধটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, রবিবার রাতে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘গুচি’ দোকানের কাছে পৃথক এক ঘটনায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আহত কিশোরটি প্রাণঘাতী নয় এবং বর্তমানে শঙ্কামুক্ত অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডেট্রয়েট পুলিশের প্রধান টড বেটিসন সংবাদমাধ্যমকে জানান, রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে পুলিশ জানতে পারে যে এক কিশোরের বুকে গুলি লেগেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ‘সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি’র একজন কর্মী তাৎক্ষণিকভাবে আহত কিশোরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
পুলিশ প্রধান আরও জানান, আহত কিশোরটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্র্যান্ড রিভার অ্যাভিনিউয়ের পাশে লাইব্রেরি স্ট্রিট এলাকায় কিশোরদের দুটি দল একত্রিত হয়েছিল এবং সেখানে তাদের মধ্যে বচসা বা সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে একটি অস্ত্র বের করা হলে গুলি ছোড়া হয়, যা ১৪ বছর বয়সী ওই কিশোরকে আঘাত করে। ঘটনার পর ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোরকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
বেটিসন বলেন, ওই দুই কিশোরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডেট্রয়েট শহরে কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্ধারিত কারফিউ অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার কম বয়সীদের জন্য রাত ১০টা এবং ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য রাত ১১টার পর চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে।
এপ্রিলের শুরুতে শহরের কেন্দ্রস্থলে কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি—যা ‘টিন টেকওভার’ নামে পরিচিত—মারামারি ও হাঙ্গামায় রূপ নিলে পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনার পর ডেট্রয়েট পুলিশের প্রধান টড বেটিসন ১৬ বছর বয়সী আয়োজকদের সঙ্গে নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি তরুণদের জন্য আরও গঠনমূলক ও ইতিবাচক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে ১০ এপ্রিল বাটজেল ফ্যামিলি রিক্রিয়েশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনের পরের রাতেই ডাউনটাউন এলাকায় আবারও কিশোর-কিশোরীদের ভিড় ও চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ওই সময় ভ্যান বুরেন টাউনশিপের ১৯ বছর বয়সী এক যুবকের ওপর ডাকাতির চেষ্টা হয়। উডওয়ার্ড অ্যাভিনিউয়ে ধাওয়া খেয়ে উপহাসরত একটি ভিড়ের মধ্য দিয়ে দৌড়ে পালাতে বাধ্য হন তিনি। পরে ডেট্রয়েট পুলিশ বিভাগের একটি টহল গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এছাড়া ক্যাম্পাস মার্টিয়াসের কাছাকাছি গুলির শব্দ শোনার খবরও পাওয়া যায়। এ ঘটনায় কমিশনার ডারিয়াস মরিস মেয়র মেরি শেফিল্ডের মন্তব্যগুলোকে “একটি অপমান” হিসেবে আখ্যা দেন।
“তরুণ প্রজন্ম বিভিন্ন ট্রেন্ড বা রীতির অনুকরণে অত্যন্ত উৎসাহী। এই ধরনের ‘টেকওভার’ বা বিশৃঙ্খল জমায়েতগুলো এখন সারা দেশজুড়েই একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে,” বলেন কমিশনার ডারিয়াস মরিস।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো একটি ‘ট্রেন্ড’ বা জনপ্রিয় রীতিতে পরিণত হয়েছে মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় এর ব্যাপক প্রচার ও প্রভাবের কারণে। তাঁর মতে, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া, শহরের সম্পদের অপচয় এবং হামলার আশঙ্কায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও এসব ঘটনার ফলে বিপুল সংখ্যক ‘ভিউ’ ও অনলাইন আলোচনার সৃষ্টি হয়, যা পরোক্ষভাবে এসব কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে।
মরিস জানান, শহর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে পুলিশ টহল ও উপস্থিতি জোরদার করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “কঠোর জবাবদিহিতা এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই পদক্ষেপগুলো এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন, কারণ গ্রীষ্মকাল সবেমাত্র শুরু হয়েছে।”
ডেট্রয়েট পুলিশের প্রধান টড বেটিসন এবং মেয়র মেরি শেফিল্ড যৌথভাবে একটি ছয়-দফা বিশিষ্ট জননিরাপত্তা পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন। পরিকল্পনায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে পুলিশ ও শহরের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে “DPD সেফ সামার স্ট্র্যাটেজি” অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ড্র্যাগ রেসিং, ড্রিফটিং ও ব্লক পার্টির মতো কার্যক্রমে নিয়ম-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি যুবসমাজকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গঠনমূলক ও ইতিবাচক কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মেয়র শেফিল্ডের এই উদ্যোগের সমর্থকরা শহরের যুব সমাজকে যুক্ত করে সমস্যার সমাধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মেয়র ও পুলিশ প্রধানের প্রশংসা করেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই পরিকল্পনা আইন ভঙ্গকারীদের কাছে ভুল বার্তা দিতে পারে এবং ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
Source & Photo: http://detroitnews.com