কুমিল্লা, ১৯ সেপ্টেম্বর : বিকেলে মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। মায়ের কাছে হয়তো সেটি ছিল আর দশটি দিনের মতোই একটি সাধারণ বিকেল—ছেলে একটু পরেই ফিরে আসবে, দরজা খুলে মায়ের সামনে দাঁড়াবে, হয়তো বলবে, ‘মা, দেখো কী ছবি তুলেছি।’
কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হলো না।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে লালমাই পাহাড়সংলগ্ন একটি ঝোপ-জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিথর দেহ। সে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শনিবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটসংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইজ পার্কের পেছনের লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অসংখ্য মানুষ গত রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শিশুকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন, সেই ক্যাম্পাসের কাছেই শেষ পর্যন্ত মিলল তার নিথর দেহ।
‘আপনারা আমার ছেলেকে বাঁচান’
শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। পরিবার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হৃদয়বিদারক আবেদন জানিয়েছিলেন মা ড. নাহিদা বেগম। তিনি লিখেছিলেন
‘আমার ছেলেকে আমি বিকেল তিনটা থেকে খুঁজে পাচ্ছি না... আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি—আমার ছেলেকে বাঁচান।’
একজন মায়ের সেই আকুতি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যমকর্মী, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ অপ্রতিমকে খুঁজে পাওয়ার আবেদন জানিয়ে পোস্ট দিতে থাকেন।
কেউ তখনও ভাবেননি, যে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য এত মানুষের আকুতি—তাকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না।
মায়ের একমাত্র সন্তান
অপ্রতিম ছিলেন ড. নাহিদা বেগম ও কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। পরিবারের কাছে সে শুধু একটি শিশু ছিল না—ছিল তাদের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ।
অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। তিনি দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এবং দ্রুত ময়নাতদন্তের উদ্যোগের কথা জানান। পরে নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।
কী হয়েছিল অপ্রতিমের সঙ্গে?
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে; তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও শোক প্রকাশ করেছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
একটি ছোট্ট ছেলে বিকেলে মায়ের ফোন হাতে নিয়ে বের হয়েছিল। হয়তো তার চোখে তখন ছিল নতুন কোনো ছবি তোলার আনন্দ, বন্ধুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর উচ্ছ্বাস, কিংবা সন্ধ্যার আগে মায়ের কাছে ফিরে আসার স্বাভাবিক নিশ্চয়তা। কিন্তু সেই বিকেলই হয়ে গেল তার জীবনের শেষ বিকেল।
অপ্রতিম আর কোনোদিন মায়ের দরজায় ফিরে আসবে না। আর কোনোদিন মাকে বলবে না—‘মা, দেখো, কী সুন্দর ছবি তুলেছি।’
একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—তার একমাত্র সন্তানকে কেন হারাতে হলো?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে কুমিল্লা। আর অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রত্যাশা- সত্য যেন চাপা না পড়ে, হত্যার রহস্য উদঘাটিত হোক এবং যারা দায়ী, তারা আইনের মুখোমুখি হোক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :