নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর: বিশ্বশান্তি ও বহুপাক্ষিকতা জোরদার, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়ন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে দেওয়া ভাষণে তিনি বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কথা তুলে ধরেন। এসব সংকট মোকাবিলায় সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদেরও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে নিজের পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, তাঁর বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়াও একই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য দিচ্ছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি।
বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্বব্যবস্থা চায়—যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘকে পারস্পরিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের অর্থ সামরিক ব্যয়ে স্থানান্তরের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বশান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগগুলোর প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গা সংকটকেও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনেও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে জনগণের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
বিশ্বশান্তি ও মানবতার কল্যাণে জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :