গ্রীষ্মকালীন অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ডেট্রয়েটের মেয়র মেরি শেফিল্ড/ Photo : David Guralnick, The Detroit News
ডেট্রয়েট, ৬ অক্টোবর: ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাস এবং গ্রীষ্মকালীন সময়ে ডেট্রয়েটে অপরাধের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন মেয়র মেরি শেফিল্ড ও পুলিশ প্রধান টড বেটিসন। সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা অপরাধ পরিস্থিতির সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এ সময় নির্বাচিত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ প্রধান বেটিসন জানান, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের অপরাধের হারই কমেছে। উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১৮ শতাংশ কমে ১০৫টিতে নেমেছে। একই সময়ে প্রাণঘাতী নয়—এমন গোলাগুলির ঘটনা প্রায় ৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২২টিতে।
তিনি আরও জানান, গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ২১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ৬৫টি ঘটনার বিপরীতে চলতি বছর এ পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫১টিতে নেমে এসেছে।
গ্রীষ্মকালেও অপরাধ কমার একই প্রবণতা দেখা গেছে। শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অ্যাডামস-বাটজেল রিক্রিয়েশন সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ‘পার্ট ১’ বা গুরুতর অপরাধের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কমেছে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন-আগস্ট সময়ে ডেট্রয়েটে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৫৬টি। চলতি বছর একই সময়ে তা কমে ৪২টিতে দাঁড়িয়েছে—যা ২৫ শতাংশ হ্রাস।
গ্রীষ্মকালে গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ২৬টি ঘটনার তুলনায় ২০২৬ সালে এ সংখ্যা কমে ১৭টিতে দাঁড়িয়েছে, যা ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়ে বাসাবাড়িতে চুরি এবং মোটরযান চুরির ঘটনাতেও গত বছরের তুলনায় দুই অঙ্কের হারে হ্রাস পেয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শেফিল্ড বলেন, “আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আগের বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ডেট্রয়েটে গ্রীষ্মকাল অনেক বেশি নিরাপদ ছিল।” তিনি জানান, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শহরে সামগ্রিক অপরাধের হারও কমেছে।
গ্রীষ্মকালে অপরাধ কমার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কিশোর হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে আসা। জুন থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে ডেট্রয়েটে একজন কিশোর হত্যার শিকার হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল নয়জন।
নিহত কিশোরটির বয়স ছিল ১৪ বছর। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ডেট্রয়েটের পশ্চিমাঞ্চলের ব্রেস স্ট্রিটে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সরকারি কৌঁসুলিরা ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে অভিযুক্ত করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গুলি করার আগে ওই কিশোর ভুক্তভোগীর ব্যাকপ্যাক ছিনিয়ে নিয়েছিল।
মেয়র শেফিল্ড বলেন, “এগুলো কেবল সংখ্যা নয়। এগুলো আমাদের বাসিন্দাদের—বিশেষ করে সেই তরুণদের—বাস্তব জীবন, যারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছে।”
তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই আরও অনেক কাজ বাকি আছে। তবে এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে আমরা যে পদক্ষেপ ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছি, তা বাসিন্দাদের জীবন এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।”
শেফিল্ড ডেট্রয়েটে অপরাধ কমার বিষয়টিকে তাঁর ‘অকুপাই দ্য সামার’ (Occupy the Summer) কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বসন্তকালে শহরের কেন্দ্রস্থলে কিশোরদের বিশৃঙ্খল জমায়েত ও তাণ্ডবের জেরে সহিংসতা ও অরাজকতার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর তিনি এ কর্মসূচি জোরদার করেন।
মেয়র জানান, কর্মসূচির বিভিন্ন আয়োজনে ১৫ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণী অংশ নিয়েছে। এসব আয়োজনে উপহার বিতরণ, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক ও ক্রীড়া কার্যক্রম ছিল। তবে শেফিল্ড স্পষ্ট করে বলেন, কিশোরদের বিশৃঙ্খল জমায়েতের প্রতিক্রিয়ায় ‘অকুপাই দ্য সামার’ কর্মসূচি শুরু হয়নি; এ ধরনের আয়োজন ডেট্রয়েটে বহু বছর ধরেই হয়ে আসছে।
কিশোর-কেন্দ্রিক এসব কার্যক্রমের বড় অংশ অনুদানের অর্থে পরিচালিত হলেও, প্রথম দুটি আয়োজনের জন্য ডেট্রয়েটের করদাতাদের তহবিল থেকে ২২ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করা হয়েছে। মেয়র শেফিল্ড, পুলিশ প্রধান টড বেটিসনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা মনে করেন, এ অর্থ যথাযথভাবেই ব্যয় করা হয়েছে।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো কর্মসূচিতে প্রায় ১৫ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়েছে। এ সময় শহরের তরুণদের মধ্যে বিনামূল্যে ৭৫০টির বেশি সাইকেল, ৭০০ জোড়া স্নিকার্স, ৫০০টি ব্যাকপ্যাক এবং আরও প্রায় ২ হাজার অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
নগর কর্মকর্তারা জানান, গ্রীষ্মকালীন কর্মসূচির আওতায় শুক্রবার আটটি বিশেষ আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে গভীর রাতে অনুষ্ঠিত তিনটি বাস্কেটবল ম্যাচে ২০০ জনের বেশি তরুণ অংশ নেয়।
বেটিসন জানান, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের কারফিউ লঙ্ঘনের ঘটনায় ৮৫টি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। তবে অভিভাবকদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে জারি করা নোটিশ বা ‘সাইটেশন’-এর সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমে ৪৪টিতে নেমেছে।
তিনি বলেন, কারফিউ লঙ্ঘনের ঘটনায় কোনো অভিভাবকের দোষ নেই বলে প্রতীয়মান হলে পুলিশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং নিজস্ব বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করেছে।
বেটিসন আরও জানান, ২০২৩ সাল থেকে গ্রীষ্মকালীন সময়ে ডেট্রয়েটে ‘পার্ট ১’ বা গুরুতর সহিংস অপরাধের হার কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে হত্যাকাণ্ড ও প্রাণঘাতী নয়—এমন গোলাগুলির ঘটনাও কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একপর্যায়ে বেটিসন বলেন, “আমি এই পরিস্থিতি নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত বা উদযাপন করছি—তা নয়। এখনও অনেক বেশি সহিংসতা ঘটছে। তবে আমাদের কৌশলটি কাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যা করছি, তা কার্যকর হচ্ছে এবং এই প্রচেষ্টাকে আমরা আরও জোরদার করে যাব। … আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি।”
বেটিসন জানান, পুলিশের লক্ষ্য হলো শেষ পর্যন্ত ডেট্রয়েটে বছরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১০০টির নিচে নামিয়ে আনা।
ডেট্রয়েট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে শহরে ১৬৫টি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডকে ‘যৌক্তিক’ বা আইনসম্মত আত্মরক্ষাসহ অনুরূপ কারণে সংঘটিত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে ১৯৬০-এর দশকের পর প্রথমবারের মতো ডেট্রয়েটে মোট হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২০০-এর নিচে নেমে আসে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১৯৬৪ সালের পর সর্বনিম্ন। ওই বছর শহরে ১২৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ কমেছে।
ডেট্রয়েট পুলিশের পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০২৫ সালে প্রাণহানিবিহীন গুলিবর্ষণের ঘটনা ২৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের ৬০৭টি ঘটনার বিপরীতে গত বছর এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪৭টিতে।
একই সময়ে গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ৪৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের ১৪২টি ঘটনার তুলনায় ২০২৫ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৭টিতে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এ ধরনের অপরাধের হিসাব রাখা শুরুর পর এটি অন্যতম বড় পতন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় সহিংস অপরাধ ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
মেয়রের ‘নেইবারহুড অ্যান্ড কমিউনিটি সেফটি’ দপ্তরের জ্যেষ্ঠ পরিচালক তেফেরি ব্রেন্ট বলেন, ডেট্রয়েটে হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য অপরাধের হারও ৬২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ব্রেন্ট বলেন, এসব পরিসংখ্যান এমন অনেক পরিবারের গল্প তুলে ধরে, যাদের প্রিয়জনের শেষকৃত্যের আয়োজন করতে হয়নি; এমন মায়েদের কথা বলে, যাদের সন্তানকে কবর দিতে হয়নি। একই সঙ্গে এসব পরিসংখ্যান এমন শিশুদের কথাও বলে, যারা নিরাপদে ঘরে ফিরে তাদের বাবা-মাকে পাশে পাচ্ছে। আর এমন সব এলাকায় শান্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে একসময় আতঙ্ক ও মানসিক আঘাত ছিল নিত্যসঙ্গী।
তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করার যে কৌশল ডেট্রয়েট গ্রহণ করেছে, তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে।
ব্রেন্ট বলেন, “ডেট্রয়েট আমেরিকাকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, অপরাধ প্রতিরোধে আন্তরিক থাকার পাশাপাশি সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং মানুষের উন্নয়নে বিনিয়োগ করাও সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা পরিচালনার পাশাপাশি কমিউনিটিকে ক্ষমতায়ন করা যায়। আর সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ বাসিন্দারা যখন অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন, তখন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।”
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :