লাখাই, (হবিগঞ্জ) ২৯ ডিসেম্বর : মাছের খালই মাথায় করে বা টেনে নৌকা থেকে নামাচ্ছেন জেলেরা। চিৎকার করে কিংবা গানের সুরে মাছের দাম হাঁকছেন কেউ। একজনের মাছ বিক্রি শেষ না হতেই আরেকজন এসে মাছ নিয়ে হাজির। আবারও শুরু হাঁকডাক। এমন করেই জেলেদের আনা মাছ বিক্রি করতে বিরামহীনভাবে হাঁক ডেকে যাচ্ছেন আড়তদাররা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারি ক্রেতাসহ স্থানীয়রা তাদের পছন্দমতো মাছ কিনে চলেছেন দর কষাকষি শেষে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত এমন দৃশ্য চোখে পড়ে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার ১নং লাখাই ইউনিয়নের মাছের আড়তে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে এবং কম দামে দেশীয় মাছ পাওয়া যায় বিধায় সেখানে প্রতিনিয়ত মাছ কিনতে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভীড় করছেন ক্রেতারা। হাওর ও নদীর মিঠাপানির মাছের সুখ্যাতি থাকায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব মাছ ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, আশুগঞ্জ, ভৈরব, কিশোরগঞ্জসহ অন্যান্য নিকটবর্তী জেলায়। আড়তদারদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হচ্ছে এই বাজারে। তবে মাছের মৌসুমে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা বেচাকেনা হয়।
লাখাই মৎস্য আড়তের আড়তদার ও সাবেক ইউপি সদস্য শওকত আকবর জানান, আড়তে প্রতিদিন গড়ে ৫ লক্ষ টাকার মতো মাছ বিক্রি হয় এবং বছর শেষে বেচাকেনা ১৮ কোটি টাকার মতো হবে। তিনি আরো জানান, দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো সুস্বাদু হওয়ায় এবং কমদামে পাওয়া যায় বিধায় পার্শ্ববর্তী জেলার নাসিরনগর, হবিগঞ্জের চৌধুরীবাজার, শায়েস্তাগঞ্জ, সুতাং, নবীগঞ্জ, আউশকান্দি, মাধবপুর, ভৈরব, আশুগঞ্জের বিভিন্ন মাছের আড়তের পাইকাররা কিনে নিয়ে যায়।
স্থানীয় জেলেরা জানান, ১নং লাখাই ইউনিয়নের কলকলিয়া, সুতাং, ধলেশ্বরী, রবিয়ারকোনা বিল, দশকামানিয়া বিল, উদাজর বিল, বাওয়া বিল সহ আশেপাশের জলাশয় থেকে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ ধরে এনে বিক্রি করা হয়। দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোর মধ্যে পাবদা, বোয়াল, মলা- ঢেলা,বাইম, শোল, গজার, টাকি, চিংড়ি, আইড়, গুলশা, চিতল, কালবাউশ, শিং, কৈ, মাগুর, এলগন, কাচকি,চান্দা, খলিশা, ট্যাংরা, পুঁটি, রুই , চাপিলা, মৃগেল, বাছা, মেনি, বেলে, গুতুম মাছ বেশি পরিমানে পাওয়া যায়।
লাখাই বাজারের সততা মৎস্য আড়তের হিসাবরক্ষক সজীব দেব জানান, শোল মাছ বিক্রি হয় ৫০০ টাকা কেজি দরে, আকারভেদে বোয়াল বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা কেজি, বাইম মাছ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, চাপিলা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি, গুলশা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, গজার ৪৫০ টাকা, কৈ মাছ ৪০০ টাকা, চিতল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, চিংড়ি ৭০০ থেকে ১৪০০ টাকা, শিং ৬০০ টাকা, আইড় মাছ ৬০০ থেকে ১৩০০ টাকা এবং নদীর রুই ৭০০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হচ্ছে।
তাউছ মিয়া নামে একজন ক্রেতা জানান, নদীর দেশীয় মাছগুলো সুস্বাদু হওয়ায় প্রায়ই মাছ কিনে ঢাকায় আত্মীয় - স্বজনদের কাছে পাঠাই।
হবিগঞ্জের বাসিন্দা সৌরভ আহমেদ জানান, প্রায়ই লাখাই বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে যাই। দেশীয় মাছের স্বাদই অন্যরকম যা চাষের মাছে পাওয়া যায় না। তাই প্রায়শই বন্ধুদের নিয়ে মোটরসাইকেলে করে ঘুরতে আসলেই মাছ কিনে নিয়ে যাই।
লাখাই অনলাইন প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানি চন্দ্র বিশ্বাস জানান, উজান থেকে নেমে আসা শিল্পকারখানার অব্যাহত দূষিত বর্জ্য এবং নদীগুলোর নাব্যতা সংকটের কারনে দেশীয় প্রজাতির মাছের পরিমান দিন দিন কমছে। তাছাড়া চায়না দুয়ারী জাল ও কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারনেও দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোর ফলন বৃদ্ধি এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য নদীগুলো খনন করতে এবং জলাশয়গুলোতে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির দাবি জানান তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan