হবিগঞ্জ : সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়। ঠিকানা, ৯১ নবাবপুর রোড, ঢাকা। সাপ্তাহিক নয়াবার্তা–র কার্যালয়। সেখানে উপস্থিত আছি আমরা ক’জন; সঙ্গে দৈনিক সংবাদ–এর স্টাফ রিপোর্টার শফিকুল আলম কাজল ভাই। হঠাৎ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “মিলন, হবিগঞ্জের নোমান চৌধুরীকে চেনো?” আমি বললাম, “না।” তখন হবিগঞ্জের দু-একজন ছাড়া কাউকেই তেমনভাবে চেনা ছিল না। কাজল ভাই জানালেন, নোমান চৌধুরী তাঁর একসময়ের সহকর্মী। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় দু’জন একসঙ্গে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি বাড়িতে ফিরে আসি। বিয়ের পর আমার স্ত্রীর পিটিআই প্রশিক্ষণ ছিল হবিগঞ্জে। সেই সূত্রেই নোমান চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। গার্নিং পার্ক এলাকার একটি বাসায় থাকতাম। সুবিধামতো বাসা পাচ্ছিলাম না। নোমান চৌধুরী সাহেব নিজেই উদ্যোগ নিলেন বাসা খুঁজে দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত বদিউজ্জামান সড়কে রূপায়ন ডেকোরেটার্সের আলাউদ্দিন ভাইয়ের বাসা আমার জন্য ভাড়া নিয়ে দিলেন। তখন আলমশেট বিল্ডিংয়ের পাশেই ছিল নোমান ভাইয়ের সাপ্তাহিক দৃষ্টিকোণ–এর অফিস।
সেই অফিস ছিল এক প্রাণবন্ত মিলনকেন্দ্র। রুহুল হাসান শরীফ, বর্তমানে আইনজীবী ও সাংবাদিক; দৈনিক হবিগঞ্জের জনতার এক্সপ্রেস এর সম্পাদক ফজলুর রহমান; বাংলাভিশন ও দৈনিক দিনকাল এর জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ নাহিজ তখন দৃষ্টিকোণ এ সার্বক্ষণিক কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে সেলিম আজাদকেও সেখানে আসতে দেখেছি। শোয়েব চৌধুরী তখন ছাত্র, সিলেটে পড়াশোনা করেন; বাড়ি এলেই দৃষ্টিকোণ অফিসে আড্ডা জমত। সকাল-বিকেল আমার সময় কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছিল সেই অফিস।
হঠাৎ একদিন নোমান ভাই বললেন, ‘ভিন্ন দৃষ্টিকোণ’ নামে একটি কলাম লেখা শুরু করো। শুরু করে দিলাম। লেখাগুলো ছিল কিছুটা রম্য, কিছুটা বিদ্রুপাত্মক। মনে ভয় কাজ করত নোমান ভাই কী বলবেন! কিন্তু দু-একটি লেখা ছাপার পরই ভয় কেটে গেল। তিনি রসিকতার ভঙ্গিতে উৎসাহ দিতেন। ধীরে ধীরে আমার পুরো পরিচয় জানার পর তিনি শুধু সম্পাদক নন, বড় ভাই হয়ে উঠলেন। আমার এক বড় ভাইয়ের সহপাঠী ছিলেন তিনি। স্নেহ-মমতার পাশাপাশি ছিল কঠোর শাসন।
অন্যের লেখায় দশটি ভুল থাকলেও অনেক সময় তা এড়িয়ে যেতেন; কিন্তু আমার লেখায় দাঁড়ি, কমা, কোনো শব্দ বা বাক্যে ভুল হলে রক্ষা ছিল না। ভুল ধরিয়ে দিয়ে জানতে চাইতেন কেন এমন হলো? তাঁর এই কঠোরতা আমাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি শুধু বড় ভাই নন, এক অর্থে আমার শিক্ষাগুরুও।
চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিল আমার বসবাস। দৃষ্টিকোণ এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকত। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে নোমান ভাই প্রকাশ করলেন দৈনিক প্রভাকর। আরডি হলে পত্রিকার উদ্বোধন হলো। লেটারপ্রেস নয়, অফসেটে ছাপা হবে, তখনকার সময়ে এটি ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক মানবজমিন এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নোমান ভাইয়ের দীর্ঘদিনের বন্ধু। বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক দিনকাল এর কূটনৈতিক রিপোর্টার মোখলেছুর রহমান চৌধুরী। উদ্বোধনের পর মাস্টার কোয়ার্টারের বাসায় অতিথিদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। অতিথিরা চলে গেলে নোমান ভাই বললেন, কাল-পরশু অফিসে এসো। দুদিন পর অফিসে গেলে তিনি দৈনিক প্রভাকর এ “‘দৃষ্টিপাত’ নামে আবারো কলাম লেখার প্রস্তাব দিলেন। তাঁর কথায় ছিল স্নেহ ও প্রত্যাশা না বলার কোনো অবকাশ ছিল না; তাই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দায়িত্বটি গ্রহণ করলাম।
এরই মধ্যে নবীগঞ্জ থেকে মাহমুদ সেলিম রেজা প্রভাকর–এ যোগ দিলেন। ভজন দাশ ছিলেন অপারেটর। সমস্যা দেখা দিল চুনারুঘাটের গাজীপুর থেকে লেখা পাঠানো নিয়ে। কিন্তু লেখা তো পাঠাতেই হবে। শোয়েব চৌধুরীর দায়িত্ব বেড়ে গেল। প্রতিদিন গাজীপুর-হবিগঞ্জ রোডের মেক্সিতে লেখা পাঠাতাম, আর সন্ধ্যায় শোয়েব মোটরসাইকেলে মেক্সি স্ট্যান্ড থেকে তা সংগ্রহ করতেন। দৃষ্টিপাত–এর নিয়মিত পাঠক তৈরি হওয়ায় নোমান ভাই আরও উৎসাহী হয়ে উঠলেন। প্রায় একশোর মতো লেখা প্রকাশিত হলো।
হঠাৎ একদিন তিনি রেগে বললেন, “কলমটা কি একটু নরম করা যায় না?” ভয়ে ভয়ে বললাম, “পাঠক তো কমে যাবে!” তিনি কিছু বললেন না, শুধু কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে আবার হবিগঞ্জে ফিরে এলাম। সেই কঠিন সময়েও নোমান ভাই ছিলেন পাশে। আলমশেট বিল্ডিংয়ে দৈনিক প্রভাকর এর অফিসে নিয়মিত আড্ডা জমত। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাঁর দৃঢ়চেতা মানসিকতা পত্রিকা প্রকাশে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। নানা সংকটের মাঝেও পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত ছিল।
কিন্তু ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল নোমান ভাইয়ের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। নোমান বখ্ত চৌধুরী শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর আদর্শ, তাঁর দেখানো সাংবাদিকতার পথ আজও উজ্জ্বল। তিনি বহু মানুষকে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার সঠিক দিশা দেখিয়ে গেছেন।
নোমান ভাই আজ নেই, কিন্তু আমরা এখনো তাঁর প্রদর্শিত পথেই চলছি। একটি কথা না বললে অন্যায় হবে তাঁর হাত ধরেই হবিগঞ্জে অনেক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সম্পাদক গড়ে উঠেছেন, যারা আজ দেশমাতৃকার সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

মিলন রশীদ :