'ইসরে! এ্যাই মেয়ে, এটা তুই কী শুরু করলি বলত? সারাদিন দম ফেলার সময় পাইনি, একটু কেবল বিছানায় এলাম। তোর যন্ত্রণায় দেখছি আজ না ঘুমিয়েই থাকতে হবে।'
হাসি ছটফটে গলায় বলে,' কেন মা, আমি আবার কী করলাম? '
'কী করলাম মানে! এত নড়ছিস কেন? অন্যদিনত বিছানায় আসতে না আসতেই ঘুমে কাদা।
আজ তোর কী হয়েছে বলত? একটু কেবল ঘুমটা ধরে আসে, অমনি তুই...'
হাসি আম্মুর কথার মাঝেই বলে,' ঘুম যে আসছে না । আমার কী দোষ বলো?,
মা তাড়াতাড়ি ওর গায়ে, মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন,' কীরে শরীর খারাপ লাগছে? জ্বর টর আসেনিত?'
'না মা, ওসব কিছু না । খুশিতে আমার ঘুম আসছে না। '
এবার মা আনন্দে ঝলমলিয়ে ওঠলেন,'ও সে কথা! এখন ঘুমা । ভোরে উঠতে হবে। '
হাসির স্কুল সকালে, এজন্য ভোরেই ওঠে। আজ একটু বেশি ভোরে ঘুম ভাঙলে রোজকার অভ্যাসমত বাগানে গেল।বাগানে কত রকমের ফুল। গোলাপ, বেলি গন্ধরাজ, কামিনী, কাঁঠালিচাঁপা। ফুলেরা ওর বন্ধু। সবাইকে ভালোবাসে।ওদের কাছে গিয়ে গানের সুরে বলে,' ঈদ মুবারক'। ভোরের বাতাসে গাছেরা দুলে দুলে ওকেও ঈদের শুভেচ্ছা জানায়।
পিঠা,পুলি জর্দা, পায়েস আর নানারকম খাবারের গন্ধে বাতাস ম ম করছে।
হাসি খুব সুন্দর একটা জামা পরে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখে। আম্মু কী সুন্দর করে রঙিন ফিতায় চুল বেঁধে দিয়েছেন। নিজেকে দেখে দেখে যেন আর আশ মেটে না।
'কইরে আমার হাসি মামণিটা কই?'
বলতে বলতে মামা ঘরে ঢুকলেন। নামাজ শেষে আব্বু আর ভাইয়াও। হাসি ছুটে গিয়ে সবাইকে সালাম করে।
মামা কোলে নিতে নিতে বললেন,' হাসিকে আজ ঠিক পরিরমত লাগছে তাই না দুলাভাই?'
আব্বু মুচকি হাসলেন। ভাইয়া একটা ভেংচি কাটল।
ছোট মামা হাসির খুব প্রিয়। ওর বন্ধু।ঝিকিমিকি চোখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কীরে আমার লেখাটা পড়েছিস?'
হাসি অবাক হওয়ার ভান করে বলে, 'কোন লেখাটা মামা?'
'সে কীরে ! ঈদ সংখ্যায় . ..'
মামার কথা শেষ না হতেই হাসি ছড়া বলতে থাকে ,
'ঈদের চাঁদের আলো মেখে
ফুটল কত ফুল/
বনে বনে গানের পাখি /
করছে খুশির ডাকাডাকি /
খোকা খুকু সবাইযে আজ আনন্দে মশগুল। /
ঝরনাধারা খবর পেয়ে উঠল গেয়ে গান/
নদীর মনে জাগল সাড়া/
আকুল ব্যাকুল পাগল পারা/
ঈদের খুশির কথা বলে সাগর- কলতান। /
ঈদের চাঁদের আসল কথা সবার জানা চাই /
বলছে ডেকে চাঁদের আলো,/
'সব মানুষে বাসবে ভালো/
ধনী গরিব ছোট বড় নাই ভেদাভেদ নাই। /'
'তবেরে দুষ্টু... '
হাসি হেসে বলে,'আচ্ছা মামা, এত সুন্দর করে তুমি কী করে লেখ? আমাকে শেখাবে?'
'শেখাতে হবে না। তুইও পারবি।'
হাসি চোখ গোল গোল করে,' আমি পারব? এ তুমি কী বলছ? কী করে পারব মামা? বলো না।'
মামা আদরের সুরে বললেন, 'বেশি বেশি বই পড়বি। লেখার হাত আসবে। অবশ্য তোর পড়ার নেশাটা ঠিক আমার মতই।দেখিস একদিন তুই আমার চেয়েও ভালো লেখবি। '
'সত্যি বলছ মামা! আমি পারব? বই পড়তে আমি খুব ভালোবাসি।তুমিত জানো। কত বই আমার। '
মামা বললেন, 'এজন্যইত তোকে বই কিনে দেই।'
হাসি আনন্দে হাসে। আসলেই ওর পড়ার খুব নেশা। এ কারণে সবাই ওকে বই উপহার দেন। কত ভালো ভালো বই। মামা এমনিতেই বই দেন। অন্যবারের মত এবার ঈদেও নতুন জামার সাথে বই দিলেন।
দুপুরে টেবিল ভরা মজাদার সব খাবার। মা ডাকলেন 'কইরে হাসি, খেতে আয়। সবাই এসে গেছে। '
মামা বললেন,' দ্যাখো গিয়ে বুবু, তোমার মেয়ে হয়ত বই নিয়ে বসে গেছে'। ডাকতে যাবেন অমনি ঝলমলে মুখে হাসি এসে হাত ধরে, ' ইস মামা! কী সুন্দর একটা বই দিলে! একটা পাখির গল্প পড়ে এলাম। কী-যে মজা।'
মামা বললেন,'দেখেছেন দুলাভাই, আমার কথাই ঠিক।বই পেলে মেয়ে দেখছি আমার মতই নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়।'
সবাই আনন্দে হাসলেন। মা বড় একটা রোস্ট হাসির পাতে তুলে দিতে দিতে বললেন,
'শুরু কর। ঠাণ্ডা হলে খেতে ভালো লাগবে না। 'খাবারে হাত দিয়েই মেয়েটা যেন কেমন হয়ে গেল। এটা সবার নজরে পড়ে।
'এ্যাই মেয়ে, কী ভাবছিস? 'মা মাথায় হাত রাখলেন । হঠাৎ করে তোর কী হলো রে? মন খারাপ কেন? যাই পুডিংটা নিয়ে আসি । '
মা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
কেউ কিছু বলার আগেই হাসি এক ছুটে কোথায় যেন গেল। বাবা অবাক হয়ে বললেন,'এভাবে মেয়েটা কই গেল? দেখত? বাথরুমে নাকি? '
মামা উঠে দাঁড়ালেন,' যাই দেখে আসি। '
তখুনি হাসি মলিন মুখে টেবিলে এসে বসে । সকলেই হতবাক,' কীরে কোথায় গিয়েছিলি? ও-মা কী হয়েছে তোর? ঈদের দিন বুঝি কেউ কাঁদে? বোকা মেয়ে আমার।'
এবার মেয়ে আকুল কান্নায় মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।কিছু বুঝতে না পেরে সকলে খাওয়া বন্ধ করে এ ওর মুখের দিকে তাকান।
'কী হয়েছে মা? আমাকে খুলে বলতো? অমন করে কাঁদছিস কেন?' মায়ের চোখ কান্নায় টলমল।
হাসি সব খুলে বলে। শুনে কেউ কোনও কথা খুঁজে পান না।
মা বললেন, 'এবার তুমি কান্না থামাও । আমি ওদের জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছি।'
'না মা, আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসব। জানো, সেই অন্ধ ভিখারিকে ছোট মেয়েটার সাথে রাস্তায় আজও বসে থাকতে দেখে এলাম। মেয়েটার নাকি মা নেই। '
কান্নায় হাসির গলা বুঁজে আসে। 'কখন দেখলিরে? "
এইযে একটু আগে। খেতে বসে ওদের কথা খুব মনে পড়ছিল। '
মা টেবিল গোছাচ্ছেন। হাসি এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়,'আবার কী হল? একটু গিয়ে শুয়ে থাক। বিকেলে বেড়াতে বের হব। এখান থেকে সর। তোর সুন্দর জামাটায় দাগ টাগ লেগে যাবে।'
হাসি দুহাতে মা কে জড়িয়ে আদুরে গলায় বলে,' আম্মু, একটা কথা বলব?'
'আবার কী কথা? ওরা খাবার দেখে কী বলল?'
' খুশি হয়ে কতযে দোয়া করল!'
'এবার তুই যা। আমিও আসছি। '
''আচ্ছা মা... ' হাসি কথা
শেষ করতে পারে না।
"কী বলবি, বল না? অমন করছিস কেন? ছাড় আমাকে। একটু গিয়ে বসি।'
হাসি আদুরে গলায় বলে,'একটা জিনিস দিতে হবে। দেবে কিনা বলো।'
মা বিরক্ত, 'এ আবার কেমন কথা? কী বলবি বল। আমার শরীর খারাপ লাগছে।'
হাসি তখন মায়ের হাত ধরে বলে, 'ঈদেতো আমি দশটা জামা পেয়েছি। একটা অই মেয়েকে দিয়ে আসি? ওর গায়ের জামাটা ছেঁড়া, ময়লা। ওর নাকি আর কোনও জামা নেই। ' কথা শুনে মা আনন্দে হাসিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ' ওরে আমার সোনামানিক, যা তোর যেটা দিতে মন চায় দিয়ে আয়, যা। '
'মা তুমি কত ভালো! 'বলতে বলতে হাসি আলমারির দিকে দৌড় দেয়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

জাহান আরা খাতুন :