ট্রয়ের বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সী পলা এডসন, গতকাল বৃহস্পতিবার ‘১২ মাইল’ ও ‘উডওয়ার্ড’ মোড়ে অবস্থিত একটি সিটগো (Citgo) স্টেশনে গাড়িতে জ্বালানি ভরছেন। তিনি একবারে ৪০ ডলারের বেশি জ্বালানি কেনেন না এবং জানান যে, টাকার অভাবে ইদানীং তিনি আর আগের মতো বেশি পথ গাড়ি চালিয়ে ঘুরতে পারেন না/Myesha Johnson, The Detroit News
রয়েল ওক, ২০ মার্চ : মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, প্রধান শোধনাগারগুলোতে সরবরাহ বিঘ্ন এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে মিশিগানের গাড়িচালকদের আরও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের সাম্প্রতিক উল্লম্ফনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেল-এর দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিশেষ করে মিশিগানে জ্বালানির দামে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
AAA (The Auto Group)-এর তথ্যমতে, শুক্রবার পর্যন্ত মিশিগানে সাধারণ আনলেডেড জ্বালানির গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে গ্যালনপ্রতি ৩.৯২ ডলার, যা সোমবারের ৩.৫৯ ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাজ্যজুড়ে দামের ভিন্নতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে বারাগা কাউন্টিতে ৩.৭৭ ডলার থেকে শুরু করে চেবয়গান ও ওনটোনাগন কাউন্টিতে তা ৪ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
মেট্রো ডেট্রয়েট এলাকায় গড় মূল্য: ওয়েন কাউন্টিতে ৩.৮৮ ডলার, ম্যাকম্ব কাউন্টিতে ৩.৯১ ডলার এবং ওকল্যান্ড কাউন্টিতে ৩.৯৫ ডলার। উল্লেখ্য, ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর বিমান হামলার কয়েক দিন পর রাজ্যজুড়ে গড় মূল্য ছিল মাত্র ২.৯৯ ডলার।
GasBuddy-এর জ্যেষ্ঠ পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, “টানা তিন থেকে চার সপ্তাহ ধরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির এমন ধারাবাহিক প্রবণতা আগে খুব কমই দেখা গেছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে গাড়িচালকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে, তবে এর পুরো মাত্রা তারা হয়তো এখনো উপলব্ধি করতে পারেননি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে সাধারণ গাড়িচালক থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবারই জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ডি হান জানান, দাম কতটা বাড়বে এবং কতদিন এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে, তা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় নাকি স্থিতিশীল হয় তার ওপর।
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কোনো সমাধান এলেও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। পরিস্থিতি যত খারাপ হবে, জ্বালানির দামও তত বাড়বে। তেলের দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।”
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় সেখানে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। “এই বিশাল বিঘ্ন ও অচলাবস্থার কারণেই তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে,” তিনি বলেন। “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বা সরবরাহ পুনরায় চালু হতে যত বেশি সময় লাগবে, অপরিশোধিত তেলনির্ভর দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব ততই তীব্র হবে—আর বাস্তবে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই তেলের ওপর নির্ভরশীল।”
তিনি আরও জানান, তেলের সরবরাহ ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে এবং দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে একটি বড় ভারসাম্যহীনতা, যা সৃষ্টি হয়েছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। “এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে, তা বলা কঠিন,” তিনি বলেন। “কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। কেউই আলোচনার টেবিলে আসতে আগ্রহী নয়। ফলে আমরা এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যেই আটকে আছি।”
অ্যালেন পার্কের একটি Marathon গ্যাস স্টেশনের মালিক হোসেন নাসের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতার কারণে গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ সেন্ট পর্যন্ত।
নাসের বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহ দাম এমনই চড়া থাকতে পারে। উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে দাম স্থিতিশীল হওয়ার আগে আরও কিছুটা বাড়তে পারে।” তিনি যোগ করেন, “গ্রাহকরা ইতোমধ্যেই এর প্রভাব টের পাচ্ছেন। অনেকে এখন কম তেল নিচ্ছেন এবং জানতে চাইছেন, কেন এত দ্রুত দাম বাড়ছে।”
GasBuddy-এর বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, এখনো অধিকাংশ মানুষ তাদের গাড়ি ব্যবহারের অভ্যাস বড় ধরনের পরিবর্তন করেননি। তবে যাদের বাজেট সীমিত, তারা ইতোমধ্যেই চাপ অনুভব করছেন। তিনি বলেন, “যারা মাস শেষে বেতনের ওপর নির্ভর করেন, তারা খুব দ্রুত বুঝতে পারছেন একবার ট্যাঙ্ক ভরাতেই অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ ডলার বেশি খরচ হচ্ছে।”
মেট্রো ডেট্রয়েটের অনেক গ্যাস স্টেশনে দাম এখন ৪ ডলারের কাছাকাছি প্রায় ৩.৮০ থেকে ৩.৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে কিছু স্টেশনে ক্রেতার সংখ্যা কমে গেলেও, তুলনামূলক কম দামের স্টেশনগুলোতে ভিড় দেখা যাচ্ছে।
রয়্যাল ওকের ১২ মাইল রোড ও উডওয়ার্ড অ্যাভিনিউ সংলগ্ন একটি Citgo গ্যাস স্টেশনে বৃহস্পতিবার বিকেলে ৩.৭৩ ডলারে পেট্রোল বিক্রি হওয়ায় দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে।
সাউথফিল্ডের বাসিন্দা জেফ লেভেনসন বলেন, “এখানেই সাধারণত সবচেয়ে কম দামে তেল পাওয়া যায়। বেশি বিক্রির মাধ্যমেই তারা লাভ সামলায় বলে মনে হয়—তাই এখানে সবসময়ই লাইন থাকে। বার্কলিতে গেলে একই তেলের জন্য প্রায় ৩.৯৯ ডলার দিতে হয়।”
দামের এই ঊর্ধ্বগতিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি আগে সেন্ট ক্লেয়ার শোরস ও গ্রোস পয়েন্ট এলাকায় কাজ করতাম। আমাকে যদি এখন আবার সেখানে গিয়ে কাজ করতে হতো, তবে পরিস্থিতিটা সত্যিই দুর্বিষহ হয়ে উঠত," বললেন লেভেনসন, যিনি বর্তমানে দূর থেকেই (রিমোটলি) কাজ করেন। তাঁর জন্য আরেকটি সুবিধাজনক বিষয় হলো, তিনি একটি ছোট গাড়ি ব্যবহার করেন, যা বেশ ভালো মাইলেজ দেয়।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :