সিলেট, ৩০ আগস্ট : সিলেটের জিন্দাবাজারস্থ অভ্র প্রকাশনীর ‘অভ্র সেন্টারে’ গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক চিন্ময় আচার্যের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘স্মৃতির পথে ৪৮ বছর’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ ও মদন মোহন সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। লেখক, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ও গ্রন্থের প্রকাশক অপূর্ব শর্মার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক, লেখক ও অনুবাদক মিহির কান্তি চৌধুরী। মূল আলোচক ছিলেন প্রফেসর স্বপন নাথ।
আলোচনায় প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “আমি বক্তব্য দেব না—এ জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে যদি কোনোদিন আমার বক্তব্য শুনতে চান, যতীন সরকার মৃত্যুর দু’মাস আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘সবকিছু অচল, কিন্তু গলাবাজি ঠিক আছে।’ গলাবাজির সুযোগ দিলে গলাবাজি করতে পারব। তাই আজ বুলেট পয়েন্টে দু-একটি কথা বলছি।”
তিনি বলেন, “আজকের দীর্ঘ প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে, সারারাত আপনারা তা শুনেছেন। আমাকে বইটি দেওয়ার পর মাত্র দুদিন হয়েছে। এর মধ্যেই আমি পুরো বইটি ধৈর্য ধরে পড়েছি। এই সুযোগে লেখক চিন্ময় আচার্য, প্রকাশক, আজকের প্রবন্ধ উপস্থাপক বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ও লেখক অনুবাদক মিহির কান্তি চৌধুরী এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে আমি শ্রদ্ধা জানাই।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যারা সামনে লিখবেন এবং যারা বর্তমানে লেখালেখি করছেন, তাঁদের উদ্দেশে প্রথমেই একটি কথা বলতে চাই। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—বাংলাদেশে স্মৃতিকথা ও আত্মকথা কি হয়েছে? আমি জেনে-শুনেই বলছি, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত স্মৃতিকথা ও আত্মকথার একটি শক্তিশালী ধারার সৃষ্টি হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমি বড় বড় মানুষদের কথা বলছি, তাঁদের স্মৃতি থেকে বলছি। আমাদের দেশের যেসব স্বনামধন্য সাংবাদিক ও লেখক চলে গেছেন, তাঁদের মধ্যে ফয়েজ আহমদ, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আবুল মনসুর আহমদ এর নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁদের অনেকেই সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি করেছেন। সত্যেন সেন সাংবাদিকতা করেছেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর ‘গ্রাম বাংলার পথে পথে’ কিংবা ফয়েজ আহমদের লেখার দিকে তাকালেও আমরা এই প্রশ্নটি করতে পারি—কেন তাঁদের স্মৃতিকথা বা আত্মকথা সেভাবে তৈরি হয়নি? এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে।”
প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “বিষয়টি হচ্ছে, চিন্ময় আচার্য কী লিখেছেন—সে বিচারে আমি এখন যাচ্ছি না। বরং আমি আশা করছি, তিনি ভবিষ্যতে আরও লিখবেন। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—স্মৃতিকথায় সবাই যখন নিজেকে উপস্থাপন করেন, তখন সেটি অনেক সময় ‘সাবজেক্টিভ’ হয়ে যায়, ‘অবজেক্টিভ’ থাকে না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আমি আপনার কাছে কেন যাব? আপনার নিজের কথা শোনার জন্য, নাকি একটি অবজেক্টিভ কথা শোনার জন্য?”
তিনি বলেন, “এ প্রসঙ্গে আমি মুনাজাত উদ্দিনের কথা স্মরণ করছি। আমার ছাত্রজীবনেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। পরবর্তীতে চাকরির সূত্রে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আমার আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে যমুনায় তাঁর সলিলসমাধি হয়। তাঁর চারটি বইয়ের কথা আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। আপনারা বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখবেন। তিনিও তো একজন সাংবাদিক ছিলেন।”
সাংবাদিকদের স্মৃতিকথার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতার কথা যখন আসে, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কয়েকজন সাংবাদিকের কথাও আমরা স্মরণ করতে পারি। মার্ক টার্লির কথা বলা যায়—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যার সম্পর্ক ছিল। তাঁর স্মৃতিকথা পড়লে সাংবাদিকতার পাশাপাশি একটি সময় ও সমাজের চিত্রও পাওয়া যায়। আরেকজন অত্যন্ত জনপ্রিয় সাংবাদিক ছিলেন ল্যারি কিং। সিএনএন শুরু হওয়ার পর তাঁর ‘Larry King Live’ অনুষ্ঠান বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল। তাঁর ‘Remarkable Journey’ পড়েও দেখা যেতে পারে। তাঁর লেখার শুরুটা হয়েছে একটি নৈর্ব্যক্তিক গল্প দিয়ে।” তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেমুর হার্শের মতো আরও অনেক সাংবাদিক রয়েছেন। সাংবাদিকতার পরিবর্তিত ধরন প্রসঙ্গে প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতার ধরন বদলে গেছে। ডিজিটাল সাংবাদিকতা এসে গেছে।
প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “২০২১ সালে ফেসবুক তার ডেটা ব্যবহার, প্রয়োগ বা বিক্রির ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে কিছু শর্ত দিয়েছিল এবং নিয়ম পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে তার ডিজিটাল নীতিমালা পরিবর্তন করতে হয়েছিল। অতএব, আজকের যুগের যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা চিন্ময় আচার্য বলেছেন, সেগুলো শুধু ব্যক্তিগত বা সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নয়; এগুলো আমাদের গ্রামবাংলাসহ সামগ্রিক সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত।”
তিনি বলেন, “আজ ফেসবুক, ইউটিউবসহ শত শত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নানা ধরনের শর্ত দিয়ে আমাদের তথ্য ব্যবহার করছে। কিন্তু আমরা অনেক সময় তা বুঝতেও পারছি না। আমি ডেটার উৎপাদক, আবার ডেটার ভোক্তাও। আমার কাছ থেকেই ডেটা নেওয়া হচ্ছে এবং সেই ডেটা আবার বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
ডেটা ও ব্যক্তিসত্তার বাণিজ্যিকীকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই যে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে, এখানেও আমরা ডেটা উৎপাদন করছি। আমাদের বক্তব্য, পরিচিতি ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো তা অন্যত্র ব্যবহার করছে। অর্থাৎ একসময় দেখা যাচ্ছে, আমার পরিচিতিই একটি পণ্যে পরিণত হচ্ছে। সেই পণ্য বিক্রি করে তারা পুঁজি আহরণ, সঞ্চয় ও আরও পুঁজি উৎপাদন করছে।”
তিনি আরও বলেন, “মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম অধ্যায়ে পণ্য সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। পণ্য হচ্ছে এমন কিছু, যার ব্যবহার ও প্রয়োগযোগ্যতা আছে এবং যা বিনিময়যোগ্য। সেই অর্থে আজ আমি নিজেই যখন ব্যবহার হচ্ছি, বিনিময় হচ্ছি এবং বিভিন্নভাবে প্রয়োগ হচ্ছি, তখন আমিও এক ধরনের পণ্যে পরিণত হচ্ছি। অর্থাৎ আমাকে দিয়ে নানা ধরনের কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
প্রবন্ধ পাঠের প্রসঙ্গ টেনে প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “আজ যে প্রবন্ধটি পাঠ করা হলো, সেটিও এখন এক ধরনের ডেটায় পরিণত হয়েছে। এই ডেটা বিক্রি হচ্ছে, প্রয়োগ হচ্ছে, ব্যবহার হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বিনিময়ও হবে। ডিজিটাল যুগের এই বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।”
প্রফেসর স্বপন নাথ বলেন, “ফলে আজকের সাংবাদিকতা আরও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে নিয়ে আসছে। এই প্রসঙ্গে আমি আরও একটি কথা স্মরণ করতে চাই—স্মৃতিকথা কীভাবে একজন ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে, তারও উদাহরণ রয়েছে। যতীন সরকার একটি বইয়ের মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বইটির নাম ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু-দর্শন’। একইভাবে আবুল মনসুর আহমদ সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ এবং ‘আত্মকথা’—এই দুটি গ্রন্থ অসাধারণ।
“সে কারণে যারা সাংবাদিকতা করছেন কিংবা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের প্রতি আমার একটি কথা আছে। মাঝে মাঝে একজন পাঠক হিসেবে আমার খুব কষ্ট হয়—এটিকে আপনারা বেয়াদবি হিসেবে নেবেন না। কোনো লেখা যখন প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায় না, তখন সত্যিই কষ্ট লাগে। কারণ আমি তো কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ। আমি যে কোনো বিনিময়ের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও মানকে গুরুত্ব দিই। ফলে আপনার সঙ্গে যখন চিন্তা বা জ্ঞানের বিনিময় করব, তখন আপনার কাজের মানও দেখব।
“এই কথাগুলো বলছি এ কারণে যে, এখানে অনেক ছোট ভাই আছেন, অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা হয়তো ভবিষ্যতে স্মৃতিকথা লিখবেন, আত্মকথাও লিখবেন। তাঁদের সেই ধারাবাহিকতার কথা মাথায় রেখেই আমি কথাগুলো বলছি। যদি কোনো কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
“সবশেষে বলতে চাই, আজকের আয়োজনটি আমার কাছে অত্যন্ত সুন্দর ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। সত্যি বলতে, আগে জানতাম না যে এমন একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন হতে যাচ্ছে। আয়োজনের ধরন ও উপস্থাপনাও আমাকে মুগ্ধ করেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

নিজস্ব প্রতিনিধি :