ডেট্রয়েট, ৩১ আগস্ট : ফেডারেল বাণিজ্য তথ্যের ভিত্তিতে ‘ডেট্রয়েট নিউজ’-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন পণ্যের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে মিশিগান থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হারের এই শুল্ক আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এটি ৭০০টিরও বেশি পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে লোহা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং এসব ধাতু দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য। এসব পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক আরোপের ফলে মিশিগানের উৎপাদন খাত বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মিশিগান ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন ওয়ালশ বলেন, “এর প্রভাব হবে ব্যাপক এবং তা শুধু মোটরগাড়ি শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, “পাল্টা শুল্কের প্রভাব মূলত বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্যের প্রধান উপাদানগুলোর ওপর পড়বে। ধাতু, প্লাস্টিক, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার গাড়ি, বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি—প্রায় সবকিছুতেই রয়েছে।”
কানাডার এই শুল্ক পদক্ষেপের আওতায় পড়বে ২০০০ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন রপ্তানি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্কের আওতায় আসা সিমেন্ট, ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য ও হকি স্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যের সমপরিমাণ মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই কানাডা এই পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। কানাডীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিল্প খাত ও অঙ্গরাজ্য—বিশেষ করে মিশিগানের মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
২৫ আগস্ট শুল্কের ঘোষণা দেওয়ার সময় কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি বলেন, “আমরা এমন সব পণ্যকে লক্ষ্য করছি, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা বিচক্ষণ ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছি। এ কারণেই আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত।”
গত এক বছরে মিশিগান কানাডায় প্রায় ২৩৬০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য কানাডার নতুন শুল্কের তালিকায় রয়েছে।
‘ডেট্রয়েট নিউজ’-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কানাডার পাল্টা শুল্কের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে মিশিগানের অবস্থান সপ্তম। ঝুঁকির দিক থেকে শীর্ষ ১০ অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সাতটিই মিডওয়েস্ট অঞ্চলভুক্ত অথবা কানাডার সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য।
আমেরিকান ফাউন্ড্রি সোসাইটির সিইও জাস্টিন স্কট এক ইমেইলে বলেন, মিশিগান “সীমান্ত-পারাপার বা আন্তঃসীমান্ত উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম সমন্বিত ও নিবিড় একটি কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।”
তিনি বলেন, “ডেট্রয়েট-উইন্ডসর করিডোরটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক সীমান্ত পারাপার পথ। এখানে সীমান্তের এক পাশে ঢালাই করা কোনো যন্ত্রাংশ চূড়ান্ত গাড়িতে সংযোজনের আগে অন্য পাশে নিয়ে গিয়ে মেশিনিং করা হতে পারে।”
তার মতে, “দুই দেশের এই পারস্পরিক একীভূত উৎপাদন ব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে এর অর্থ হলো, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মিশিগানকে শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতার প্রভাব দ্রুত অনুভব করতে হয়।”
এই বিশ্লেষণে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকির একটি আনুমানিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে; এটি সব ধরনের রপ্তানি পণ্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়। কানাডার শুল্ক তালিকায় থাকা পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে গত ১২ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। দুই দেশের পণ্য শ্রেণিবিন্যাস কোডের পার্থক্যের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ বেশি দেখাতে পারে। আবার পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল বা অঙ্গরাজ্যের তথ্য নথিভুক্ত না করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য রপ্তানি হওয়ার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কমও দেখাতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বাণিজ্য ঝুঁকি নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে পেনসিলভেনিয়া। মিশিগানের সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য ওহাইও, ইন্ডিয়ানা এবং শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত উইসকনসিন রয়েছে যথাক্রমে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও নবম স্থানে।
কানাডায় পণ্য রপ্তানিকারক মিশিগানের কোম্পানিগুলোকে হয় শুল্কের বাড়তি খরচ নিজেদের বহন করতে হবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিংবা বিদেশে নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে নিতে হবে।
প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বহুমুখী ও বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মিশিগানের ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মিশিগানের রপ্তানি আগের বছরের ২৪৬০ কোটি ডলার থেকে কমে গত বছর ২৩২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশসহ মিশিগানের মোট রপ্তানি ৬২৮০ কোটি ডলার থেকে কমে ৬০৩০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ওয়ালশ বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ এবং এর জবাবে বিভিন্ন দেশের পাল্টা শুল্কের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি বোঝাতে তিনি একটি টেলিফোন খুঁটির উদাহরণ দেন। “এটি ধাতু দিয়ে তৈরি। কেউ না কেউ এটি তৈরি করছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে এটি কানাডা থেকে আসে, তবে এর জন্য সরবরাহকারীদের একটি বড় নেটওয়ার্ক বা ‘পুল’ রয়েছে,” তিনি বলেন।
“সরবরাহকারীদের বড় কোনো উৎসের ওপর—যেমন কানাডার ওপর—আঘাত এলে এর প্রভাব পুরো সরবরাহকারী গোষ্ঠীর ওপর পড়ে। সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্য কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলে ইস্পাত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চাইলেই তাদের পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রাখতে পারে না। এর ফলে সামগ্রিকভাবে বিরূপ প্রভাব পড়ে।”
ওয়ালশ জানান, গত এক বছরে শুল্ক-সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের কারণে মিশিগানের উৎপাদনকারীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েছেন। “এই অনিশ্চয়তা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা করার সুযোগই আর থাকছে না,” তিনি বলেন। “এর অর্থ হলো বাড়তি খরচ এবং নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা—তা সাময়িক হোক বা দীর্ঘমেয়াদি। এতে কাজের চাপও বাড়ে। অথচ উৎপাদনকারীদের সামনে আরও অনেক কাজ ও অগ্রাধিকার রয়েছে।”
স্কট বলেন, ফাউন্ড্রি—অর্থাৎ ধাতু গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়ার কারখানা—হলো “পুঁজি-নিবিড় ব্যবসা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বাণিজ্য শুল্কের মতোই এই অনিশ্চয়তাও অত্যন্ত ক্ষতিকর। সীমান্তের উভয় পাশের সদস্যরা আমাদের একই কথা বলছেন—তাদের এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন, যাতে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ধারণা নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারেন।
“পরিবর্তনশীল বাণিজ্য পরিস্থিতির সঙ্গে ফাউন্ড্রিগুলো মানিয়ে নিতে সক্ষম। তবে এই অভিযোজনের জন্য সময় ও পুঁজি প্রয়োজন। পরিস্থিতি যখন প্রতি সপ্তাহে বদলাতে থাকে, তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা, উৎপাদন সক্ষমতার পরিকল্পনা এবং নতুন বিনিয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।”
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :